ইসলামপুরের কাশ্মির বিরানী হাউজ এর খাবার

0
683

কোনো কাজেই হোক বা নিছক ঘুরতে পুরান ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করলেই বিরিয়ানি বা কাচ্চির ছবি চোখে ভাসতে শুরু করে। যে এলাকায় যাবো আগেভাগেই সেখানে কোথায় খাবো তা ঠিক করে নিই। তবে গত সপ্তাহে জরুরি কিছু কাজে ইসলামপুরে যাওয়ার আগপর্যন্ত খাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিলো না।

হাতে অনেকগুলো কাজ থাকায় ভেবেছিলাম খাওয়ার সময় পাবো না। কিন্তু সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছিলেন সাথে থাকা একজন বড় আপু। ইসলামপুরে ঢুকে কাজ শুরু করার আগেই আপু খাওয়ার পর্ব সেরে নেয়ার প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। এরপর আর আমার মতো একজন খাদ্যপ্রেমী ‘না’ বলতে পারে না। আমিও পারিনি।

কাচ্চি; Source: লেখিকা

আপু খাওয়ার কথা বলার পরেই মাথায় জমানো খাদ্য বিষয়ক তথ্য ঘেঁটে বের করলাম, ইসলামপুরের “কাশ্মির বিরানী হাউজ” নাম। এর সুনাম শুনেছিলাম একজন পুরান ঢাকাইয়ার থেকে। দোকানের নামে বিরিয়ানিকে “বিরানী” লিখে বোধহয় কিছুটা আঞ্চলিকতা ধরে রাখতে চাওয়া হয়েছে বা নিছকই বানান ভুল করেছে।

তবে বানান ভুল হলে হয়তো এতোদিন ধরে ভুল বানানে সাইনবোর্ডটি রাখতো না। সেজন্যই আমার ধারণা আঞ্চলিকতা ধরে রাখতেই নামটি এমন। যাক সে কথা, নাম নিয়ে বিস্তর গবেষণা না করলেও চলবে। গবেষণায় এবার কাশ্মির বিরানী হাউজের খাবার নিয়ে আসি। দোকানটিতে ঢুকে দেখি প্রচণ্ড ভিড়। তারমধ্যে তখন দুপুরবেলা।

কাশ্মির বিরানী হাউজ; Source: লেখিকা

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কোণার দিকে একটি টেবিল খালি পেয়ে বসে পড়ি। কিছুক্ষণ বসে থাকার পরেও দেখি কোনো ওয়েটারেরই অর্ডার নেয়ার কোনো খবর নেই। পরপর দুইবার ডাকার পর কমবয়সী একটি ছেলে রীতিমতো হেলেদুলে এলো অর্ডার নিতে। তার থেকেই কী কী পাওয়া যাবে জেনে নিয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি, পোলাও রোস্ট, জালি কাবাব এবং বোরহানি অর্ডার করলাম।

অর্ডার নেয়ার পর আর আগের অবস্থা হলো না। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই টেবিলে খাবার চলে এলো। সেদিন খুব বেশি ক্ষুধা ছিলো না। তাই সামনে খাবার পেয়ে তাড়াহুড়ো করারও কিছু ছিলো না। তবে সামনে কাচ্চি চলে আসলে তাড়াহুড়ো না করারও কোনো উপায় থাকে না। কিছু ছবি তুলেই খাওয়া শুরু করে দিলাম। এবার খাবারের ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা করছি।

কাচ্চি বিরিয়ানি

কাচ্চি বিরিয়ানি; Source: লেখিকা

পুরান ঢাকা আর কাচ্চি বিরিয়ানি শব্দ দুটো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পুরান ঢাকায় গেলে আমার লোভ থাকে কাচ্চির দিকেই। আমি নিজের জন্য কাচ্চিই নিয়েছিলাম। খাওয়া শুরুর পর বুঝলাম কিছু খাবার যতোটা সুস্বাদু তার থেকেও সুনামের জন্য বেশি বিখ্যাত। কাশ্মির বিরানী হাউজের কাচ্চির স্বাদ বেশ ভালোই ছিলো। তবে যতটুকু সুনাম শুনেছিলাম সেই তুলনায় স্বাদ বেশ কম।

কাচ্চির সাথেই একটি জালি কাবাব থাকে। বেশ বড় আকারের দুই টুকরো খাসির মাংস ছিলো। এরমধ্যে একটি অবশ্য হাড়। কাচ্চির চাল বেশ ঝরঝরেই ছিলো। কাচ্চির রাইসের পরিমাণও ছিলো অনেক। আমি পুরোটা খেয়ে শেষ করতে পারিনি। কিন্তু আলু ছাড়া কী করে কাচ্চি বিরিয়ানি হয় বুঝতে পারছিলাম না! আমি কাচ্চির চেয়েও বেশি কাচ্চির আলুপ্রেমী। তাই কাচ্চিতে আলু না পাওয়ায় মন বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।

পোলাও রোস্ট

পোলাও রোস্ট; Source: লেখিকা

সাথে যে আপু ছিলো উনার মুরগির মাংস খেতে ইচ্ছে করছিলো। সেজন্যই উনি পোলাও রোস্ট নিয়েছিলেন। আপুর বদৌলতে আমার কাশ্মির বিরানী হাউজের পোলাও রোস্ট চেখে দেখা হয়ে গিয়েছিলো। কাচ্চির মতোই পোলাওয়ের পরিমাণও ছিলো অনেক। মাংসের টুকরোটিও যথেষ্ট বড়। তবে আমার কাছে পোলাও একবারে স্বাদহীন লেগেছিলো।

মুরগির মাংসটি বেশ সুস্বাদু ছিলো। পোলাও রোস্টের প্লেটটিতে সবচেয়ে ভালো লেগেছে মাংসের ঝোলটুকু। আমার মনে হয়েছিলো, শুধু ঝোল দিয়েই এক প্লেট পোলাও খেয়ে নেয়া যাবে। তবে পোলাও তেমন ঝরঝরে ছিলো না। পোলাওয়ের ঘ্রাণও ভালো লাগেনি।

জালি কাবাব

জালি কাবাব; Source: লেখিকা

সবধরনের কাবাবের মধ্যে জালি কাবাব আমার খুবই প্রিয়। কাশ্মির বিরানী হাউজের কাচ্চি বিরিয়ানির সাথে একটি জালি কাবাব ছিলো। এছাড়াও আমরা আরেকটি জালি কাবাব নিই। কাবাবটি বেশ সুস্বাদু। আকারের বেশ বড়। যদিও জালি কাবাবটিতে খুব বেশি মাংস ছিলো না। মাংসের চেয়ে বেশি পেঁয়াজ ছিলো। তবে গরম আর মুচমুচে হওয়ায় খেতে ভালো লেগেছে।

বোরহানি

বোরহানি; Source: লেখিকা

কাশ্মির বিরানী হাউজে খাওয়া সব খাবারের মধ্যে বোরহানিই সবচেযে সুস্বাদু ছিলো। সদ্য বরফ দেয়া বোরহানি যেমন ঠাণ্ডা হয়, তেমন ঠাণ্ডা। বোরহানি একেবারে ঠাণ্ডা না হলে পান করতে তেমন ভালো লাগে না। পুদিনাপাতা এবং লেবুর ঝাঁঝও পরিমাণ মতোই ছিলো। বোরহানিতে ব্যবহার করা দইও বেশ মজাদার, পান করার সময় বোঝা যাচ্ছিলো।

রেটিং

কাচ্চি বিরিয়ানি – ৭/১০
পোলাও রোস্ট – ৭/১০
বোরহানি – ৯/১০

মূল্য

কাশ্মির বিরানী হাউজের হাফ প্লেট কাচ্চির মূল্য ২০০ টাকা এবং হাফ প্লেট পোলাও রোস্টের মূল্য ১৫০ টাকা। এক গ্লাস বোরহানি ৪০ টাকা করে।

মূল্য তালিকা; Source: লেখিকা

পরিবেশ এবং সার্ভিস

পুরান ঢাকাইয়া সাধারণ মানের যেকোনো হোটেল যেমন হয় কাশ্মির বিরানী হাউজটিও ঠিক তেমনই। অল্প জায়গায় বেশ কিছু সাধারণ কাঠের চেয়ার-টেবিল সাথে প্রচুর ভিড়। ভিড় এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত না হওয়ায় ভেতরে ভ্যাপসা গরম। খুব আয়েশ করে খাওয়া যাবে এমন নয়। সবকিছুই বেশ সাধারণ।

পরিবেশ; Source: লেখিকা

দোকানটির সার্ভিস একদমই ভালো লাগেনি। খাবারের অর্ডার দেয়ার জন্য ডেকেও কাউকে পাওয়া যায়নি। খাওয়ার মাঝখানে একটি বাড়তি জালি কাবাব দিতে বলি। অনেকক্ষণ চলে যাওয়ার পরেও না দেয়ায় আবার বললে তারা জানায় ভুলে গিয়েছিলেন। একজনকে কাচ্চির দাম জিজ্ঞেস করায় বলেন, ম্যানেজারের থেকে জেনে নিতে। আসলে সার্ভিসের অবস্থা খুবই খারাপ।

লোকেশন

১১৭/৬/৭, ইসলামপুর রোড, ঢাকা। শাঁখারি বাজার থেকে ইসলামপুর ঢোকার রাস্তার শুরুতেই কাশ্মির বিরানী হাউজ অবস্থিত।

Feature Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here