ঘরোয়াভাবে চট্টগ্রামের বিখ্যাত আখনি বিরিয়ানি তৈরির রেসিপি

0
1189

পুরান ঢাকাইয়াদের পরেই আমার মনে হয়, খাবার-দাবারে রাজকীয় ভাব থাকা অঞ্চল হলো চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের আচার-অনুষ্ঠান মানেই মজাদার সব খাবারের বিশাল সমাহার। কালাভুনা, মেজবানি মাংস, আখনি মাংস ইত্যাদি মাংসের আইটেম অত্যাধিক জনপ্রিয়। সেইসাথে আরেকটি জনপ্রিয় আইটেম হলো আখনি বিরিয়ানি। চট্টগ্রামের লোকজনদের থেকে শুনেছিলাম, চট্টলাবাসীদের সপ্তাহে একদিন আখনি বিরিয়ানি না হলে চলেই না।

আমি ভোজনরসিক মানুষ। খাবাররের প্রতি বিশাল আগ্রহ। আর বিরিয়ানি তো নিখাদ ভালোবাসা। বেশ কয়েকবার চট্টগ্রামে ঘুরতে গেলেও আখনি বিরিয়ানি খেয়ে আসা হয়নি। তবে চট্টগ্রামের বাইরের একটি রেস্টুরেন্টে বছর চারেক আগে আখনি বিরিয়ানি খেয়েছিলাম। সেই স্বাদ এখনো যেন মুখে লেগে আছে। কয়েকদিন ধরেই আবার আখনি বিরিয়ানি খেতে মন চাইছিলো। কোথায় খেলে ভালো হবে এসব ভাবতে ভাবতেই মনে হলো নিজেই রান্না করে ফেলি।

আখনি বিরিয়ানি; Source: লেখিকা

এটাই রান্না করতে জানার অন্যতম সুবিধা। কিছু খেতে মন চাইলে নিজেই তৈরি করা যায়। রান্না যখন করবোই, তখন আখনি বিরিয়ানির রেসিপিও খুঁজে বের করে নিলাম। এরপর বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব জিনিসও কিনে নিয়ে এলাম। আখনি বিরিয়ানি তৈরি করতে টক দই লাগে। বাসার কাছের দোকানে টক দই না পাওয়ায় ঘরেই টক দই তৈরি করে নিলাম। সব যোগাড়যন্ত্র যখন শেষ, তখন চলে এলো রান্নার পালা।

আখনি বিরিয়ানিকে অনেকেই আখনি পোলাও বলে থাকেন। সাধারণ বিরিয়ানির থেকে আখনি বিরিয়ানির পার্থক্য হলো সাধারণ পানির পরিবর্তে এই বিরিয়ানি তৈরি হয় আখনি দিয়ে। আখনি কী তা না জানলে আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে জানতেও পারবেন। সিলেটেও ইফতারে আখনি খিচুড়ি/পোলাও একটি জনপ্রিয় খাবার। তবে সিলেটে আখনির সাথে ছোলাও ব্যবহার করা হয়। আমি অন্য কোনো দিন ছোলা দিয়েও আখনি রান্না করার চেষ্টা করবো।

আখনি পোলাও; Source: লেখিকা

আখনি বিরিয়ানি সম্পর্কে অনেককিছু তো বলেই দিলাম। এবার সরাসরি চলে যাচ্ছি রেসিপিতে। আখনি বিরিয়ানি তৈরি করা খুব কঠিন কিছু নয়। তবে সাধারণ বিরিয়ানি থেকে আখনি বিরিয়ানি রান্না করতে একটু বেশি সময় লাগে। আর এই বিরিয়ানি তৈরি করতে বেশ কিছু উপকরণেরও প্রয়োজন হয়। এবার তাহলে চলুন জেনে নিই, ঘরে বসেই কীভাবে চট্টগ্রামের বিখ্যাত আখনি বিরিয়ানি খাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়।

প্রয়োজনীয় উপরকণ

আখনির জন্য

  • ১/২ কেজি মুরগির মাংস (গরুও ব্যবহার করা যাবে)
  • ২টি বড় পেঁয়াজ (৪ টুকরো করে কাটা)
  • ১টি রসুন (আস্ত কোয়া)
  • ৪ টুকরো আদা
  • ২ টেবিল চামচ আস্ত জিরা
  • ২ টেবিল চামচ আস্ত ধনিয়া
  • ৭-৮ টি আস্ত লং
  • ৬টি আস্ত এলাচি
  • ৪-৫ টুকরো আস্ত দারুচিনি
  • ৩টি তেজপাতা
  • সামান্য জয়ত্রি
  • লবণ

উপকরণ; Source: লেখিকা

পোলাওয়ের জন্য

  • ১ কেজি চিনিগুঁড়া চাল
  • ৩ টেবিল চামচ ঘি
  • ২ কাপ টক দই
  • ৪ টি আলু (ব্যবহার করতে চাইলে)
  • ১/২ ধনিয়া গুঁড়ো
  • ১/২ চা চামচ মরিচ গুঁড়ো
  • ১ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো
  • ১ চা চামচ বিরিয়ানি মশলা (না দিলেও চলে)
  • ১/২ কাপ পেঁয়াজ কুচি
  • ২ টেবিল চামচ রসুন বাটা
  • ২ টেবিল চামচ আদা বাটা
  • ২ টেবিল চামচ জয়ফল-জয়ত্রি বাটা
  • ৭-৮ টি কাঁচা মরিচ
  • লবণ

প্রস্তুত প্রণালি

১. প্রথমেই বড় একটি পাত্রে দেড় লিটার পানি দিয়ে আখনি তৈরির সব উপাদানগুলো দিয়ে চড়া আঁচে চুলায় বসিয়ে দিই। জ্বাল হতে হতে পানি কমে অর্ধেক হয়ে এলে চুলা থেকে আখনি নামিয়ে নিতে হবে।

এই পানিটিই অর্থাৎ স্টুই হলো আখনি বিরিয়ানি তৈরির প্রধান উপাদান। এরপর পানি থেকে মাংসগুলো আলাদা করে সরিয়ে নিই। মাংস সরিয়ে ছেঁকে সব মশলা আলাদা করে আখনি প্রস্তুত করে নিই।

আখনি তৈরির মাংস ও মশলা; Source: লেখিকা

২. আমি রান্না করা ঘণ্টা দুয়েক আগে চিনিগুঁড়া চাল ধুয়ে পানিতে ভিজিয়ে রেখেছিলাম। এভাবে চাল পানিতে ভিজিয়ে রাখলে ভালোভাবে সেদ্ধ হয়। আখনি তৈরি করার পর বেঁচে যাওয়া মশলাগুলোও বেটে নিয়েছিলাম। এই মশলাগুলো বেটে নাও দিতে পারেন।

বেঁচে যাওয়া আখনির মশলাগুলো বিরিয়ানে দিলে বিরিয়ানিটি বেশ মশলাদার এবং ঝাঁঝালো স্বাদের হয়। আলুগুলোও কেটে ২ টুকরো করে হালকা লবণ দিয়ে ভেজে রেখেছিলাম। যারা আলু পছন্দ করেন না, তারা নাও ব্যবহার করতে পারেন।

আখনি এবং আখনি থেকে আলাদা করা মাংসগুলো; Source: লেখিকা

৩. এবার একটি ননস্টিক বড় প্যান চুলায় বসিয়ে অল্প আঁচে গরম করে নিন। প্যানটি গরম হয়ে গেলে এতে ঘি দিয়ে দিন। ঘিয়ের পরিবর্তে সয়াবিনও তেলও ব্যবহার করতে পারেন। তবে পোলাও জাতীয় রান্নায় তেলের চেয়ে ঘিই ভালো ফ্লেভারের সৃষ্টি করে।

ঘি আগুনের তাপে গলে গিয়ে হালকা গরম হয়ে এলে প্যানে পেঁয়াজ কুচিগুলো দিয়ে নেড়েচেড়ে ২ মিনিট ভাজুন। পেঁয়াজ ভাজা হয়ে গেলে এতে প্রথমেই আদা বাটা, রসুন বাটাসহ সব বাটা মশলাগুলো দিয়ে মিনিট খানেক ভাজুন। এরপর একে একে সব গুঁড়ো মশলা এবং লবণ দিয়ে দিন।

মাংস কষানোর পর দই দেয়া; Source: লেখিকা

৪. সব মশলাগুলো দিয়ে সামান্য পানি দিয়ে মিনিট তিনেক কষিয়ে নিন। এরপর এতে আখনি থেকে তুলে রাখা সেদ্ধ মাংসগুলো দিয়ে দিন। আমি আখনি তৈরি করতে মুরগির হাড়গোড়ের অংশের মাংসগুলো ব্যবহার করেছিলাম।

তবে যেকোনো মাংসই ব্যবহার করা যাবে। মাংস দিয়ে নেড়েচেড়ে ২ মিনিট কষিয়ে নিন। এরপর এতে দই দিয়ে দিন। দই দিয়ে আরো মিনিট চারেক ভাজার পর কাঁচা মরিচগুলো দিয়ে দিন। এরপর আরো ১ মিনিট মাংস কষান।

অল্প অল্প করে চাল দেয়া; Source: লেখিকা

৫. মাংস কষানো হয়ে গেলে এতে আখনি দিয়ে দিন। আখনির পানি যদি চালের দ্বিগুণ না হয় তাহলে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করুন। আমার মতো আলু দিতে চাইলে আলু সেদ্ধ হওয়ার জন্যও অতিরিক্ত ২ কাপ পানি লাগবে।

এরপর চাল ঢেলে দিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন। আলু ব্যবহার করলে এসময় চালের সাথে দিয়ে দিতে ভুলবেন না যেন। চুলার আঁচ এসময় মাঝারি মানের রাখলেই হবে।

বিরিয়ানি দমে বসানো; Source: লেখিকা

৬. ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে চাল সেদ্ধ হয়ে পানি প্রায় শুকিয়ে গেলে প্যানটি চুলা থেকে নামিয়ে নিন। এই সময়টিতে মাঝেমাঝে বিরিয়ানি নাড়িয়ে দিবেন। চুলায় ১টি তাওয়া বসিয়ে দিন। চুলার আঁচ একবারেই কমিয়ে দিন। প্যানের বিরিয়ানি ১টি বড় চামচ দিয়ে সমান করে চেপে বসিয়ে দিন।

এরপর প্যানটি তাওয়ার ওপর দিয়ে দমে বসিয়ে দিন। দমে বসানোর পর অবশ্যই ৪-৫ মিনিট পরপর নাড়তে হবে। ১৫ মিনিটের মতো দমে থাকার পর দেখবেন বিরিয়ানির পানি একবারেই শুকিয়ে গিয়ে ঝরঝরে হয়ে গেছে। চালও তখন ভালোভাবে সেদ্ধ হয়ে যাবে।

প্রস্তুতকৃত আখনি বিরিয়ানি; Source: লেখিকা

৭. দম দেয়া শেষ হয়ে গেলে চুলা থেকে নামিয়ে নিন। আপনার ঘরেই তৈরি হয়ে গেলো চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আখনি বিরিয়ানি। গরম গরম পরিবেশন করুন।

Feature Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here