চট্টগ্রামের মিডওয়ে ইন-এ মাঝরাতে খিচুড়ি খাওয়ার অভিজ্ঞতা

0
632

সেন্টমার্টিনে দুইদিন কাটানোর পর যখন ঢাকার উদ্দেশে ফিরছিলাম তখন শেষবারের মতো সেখানে দুপুরের খাবারে রূপচাঁদা মাছের ফ্রাই খাওয়ার সুযোগ হয়। তবে সফরের শেষ সময়ে এসে সেন্টমার্টিনের হোটেল ‘আল্লাহর দান’-এ আমাদের অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই বাজে। বাড়তি দাম, বাজে খাবার, প্যাকেজ হওয়া সত্ত্বেও পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার না দেওয়া, সব মিলিয়ে বেশ বিরক্তি নিয়েই সেন্টমার্টিন ত্যাগ করি।

সেন্টমার্টিন থেকে সাধারণত জাহাজ ছাড়ে বিকাল তিনটার সময়। যথাসময়ে জাহাজ ছাড়ার পর বেশ কিছুক্ষণ ভেতরে বসে বসে বিশ্রাম নিই। এরপর বঙ্গোপসাগরের সৌন্দর্য দেখার জন্য ভেতর থেকে বাইরে আসি। সেন্টমার্টিনে যাওয়ার আসল মজাই এই জাহাজ ভ্রমণ। এক ঝাঁক সাদা সিগালের বিরামহীনভাবে জাহাজের পেছনে উড়ে বেড়ানো যে কাউকে মুগ্ধ করবে। তবে আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম টেকনাফ পৌঁছানোর পর।

ছবি: লেখক

যেদিন আমরা টেকনাফের জেটিঘাট থেকে জাহাজে উঠি সেদিন এর বিপরীত পাশে থাকা পাহাড় খেয়াল করিনি। হটাৎ করে সেখানে পাহাড় দেখে যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম। প্রায় তিন ঘণ্টা জাহাজে কাটানোর পর আমাদের টেকনাফে নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে আমাদের গন্তব্য ছিল ঢাকা। সেন্টমার্টিন যাওয়ার দিনই বাসের টিকিট বুকিং দিয়েছিলাম। তাই জাহাজ থেকে নেমেই সরাসরি বাসে উঠে পড়ি। কিন্তু যানজটের কারণে বাস বের হতেই অনেক সময় লেগে গেলো।

চট্রগ্রাম থেকে যেদিন টেকনাফ আসি সেদিন ছিলাম ঘুমের মধ্যে। ফলে আশাপাশে কোনো কিছুই দেখতে পারিনি। যাওয়ার পথে বাসের প্রথম সিটে বসেছিলাম। ফলে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার আসার পথে যে পাহাড়ি রাস্তার চারপাশের সৌন্দর্য সহজেই দেখার সুযোগ হয়। টেকনাফ থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় ১৮০ কিলোমিটারের ওপরে। ফলে এত রাস্তা পার হতে হতে মোটামুটি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে।

ছবি: মিডওয়ে ইন

কক্সবাজার ছাড়ানোর পরপরই পেটে ক্ষুধা অনুভব করছিলাম। তাই বাসের সুপারভাইজারকে জিজ্ঞেস করলাম বাস কোথায় থামাবে। তিনি জানান, চট্টগ্রামের লোহাগড়ায় যাত্রা বিরতি দেবে। রাত যখন প্রায় ১২টা তখন যাত্রা বিরতি দেওয়ার জন্য চট্টগ্রামের লোহাগড়ার ওকেএম মিডওয়ে ইনে থামানো হয়। রাস্তার পাশের এই রেস্টুরেন্টগুলোতে খাবারের দাম কয়েক গুণ বাড়তি হয়, সে কারণে মাঝে মাঝে খেতে অনীহাবোধ করি। কিন্তু যেহেতু ঢাকা যেতে যেতে ভোর হয়ে যাবে, তাই ভারী কিছু খেতেই হবে।

ছবি: মিডওয়ে ইন

হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করে প্রথমে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। আমার সাথে ছিল আমার এক বন্ধু। আমরা দুইজন একটি টেবিলে বসার পর একজন ওয়েটারের কাছে খাবারের মেন্যু সম্পর্কে জেনে নিই। তখন ভারী খাবার হিসেবে খিচুড়ি, ভাত ও বিরিয়ানি ছিল। সাথে গরু ও খাসির মাংস। আমরা খিচুড়ি ও গরুর মাংস অর্ডার করি। অর্ডার করার দুই মিনিটের মধ্যেই টেবিলে খাবার পরিবেশন করা হয়।

খাবারের মান ও স্বাদ

ঢাকায় দীর্ঘদিন থাকার পরও আমি ঢাকার কোনো রেস্টুরেন্টের খিচুড়ি খেতে পারি না। আমার কাছে ঢাকার খিচুড়ি কিংবা বিরিয়ানি, এর কোনোটাই ভালো লাগে না। অন্যদের কাছে ভালো লাগলেও আমার কেন খারাপ লাগে সেটা আমি জানি না। তবে অতিরিক্ত মসলা ও খাবারের মান নিয়ে সন্দেহ হওয়ার কারণেই ঢাকায় তৃপ্তি সহকারে খেতে পারি না।

ছবি: লেখক

কিন্তু মিডওয়ে ইনের খিচুড়ি একবার মুখে দেওয়ার সাথে সাথে একেবারে বাসায় রান্না খিচুড়ির মতো মনে হলো। খিচুড়ির সাথে সম্ভবত সরিষার তেল দেওয়া ছিল, যেখান থেকে বেশ ভালো একটি সুগন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। এর সাথে খিচুড়ির নিচে দেওয়া ছিল গরুর গরম মাংস। খিচুরি ও মাংস আলাদা আলাদা রান্না করা।

ছবি: লেখক

অধিকাংশ রেস্টুরেন্টে মাংস খেতেই অস্বস্তিবোধ করি। ঢাকার কোনো রেস্টুরেন্টে বেশি পরিমাণে মাংস দিলেই সন্দেহ হয় আমার। সেখানে মিডওয়ে ইনের খিচুড়ির সাথে আনুমানিক ২০০ গ্রামের মতো মাংস ছিল। এরপরও আমার একবারের জন্যও এই মাংস নিয়ে সন্দেহ হয়নি। খাওয়ার সময়ই বোঝা যাচ্ছিল গরুর মাংস ছিল একদম টাটকা। গরম খিচুড়ির সাথে গরুর ভুনা মাংস এমনিতেই অনেক মজার। এর সাথে আমরা যখন খাচ্ছিলাম তখন মাঝরাত, ফলে একটু শীতের আবহাওয়া ছিল। তবে মিডওয়ে ইনের খিচুড়ি-মাংস আসলেই অনেক সুস্বাদু ছিল।

পরিবেশ ও পরিবেশন

বিশাল এই রেস্টুরেন্টের ভেতরের পরিবেশ একদমই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কেননা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে রুটের প্রায় সমস্ত বাসই মিডওয়ে ইন রেস্টুরেন্টে যাত্রা বিরতি করে। ফলে বিপুল সংখ্যক যাত্রীর একসাথে বসার ব্যবস্থা রয়েছে। হোটেলের ভেতরের সাজসজ্জা বেশ জমকালো। তাই বেশ তৃপ্তি সহকারে এখানে খেতে পারবেন।

ছবি: মিডওয়ে ইন

খাবার পরিবেশনও বেশ ভালো ছিল। এখানকার প্রায় সকল ওয়েটারই বেশ স্মার্ট। তারা বেশ সুন্দর করে কথা বলেন এবং সুন্দরভাবে পরিবেশনও করেন। আমাদের প্লেটের মধ্যে সুন্দর করে খিচুড়ি সাজিয়ে দুইটি চামচ ও একটি করে পানির বোতল দিয়ে খাবার পরিবেশন করা হয়। এছাড়া আর তেমন কিছু ছিল না। অবশ্য প্রয়োজনও ছিল না।

ব্যবহার

মিডওয়ে ইনের কর্মী ও অন্যান্যদের ব্যবহার বেশ ভালো। তারা তাদের গ্রাহকদের সন্তুষ্ট করার জন্য বেশ সচেষ্ট হতে দেখেছি।

দরদাম

মিডওয়ের ইনের এক প্লেট খিচুড়ি ও গরুর মাংসের দাম ২৪০ টাকা। সাথে এক বোতল পানির দাম ১৫ টাকা। তবে এখানে খিচুড়ির সাথে খাসির মাংসও পরিবেশন করা হয়। তবে সেটার দাম নির্ধারিত নয়। অনেকের কাছে দাম শুনে হয়তো একটু বেশি মনে হতে পারে। তবে আপনি যখন এই রেস্টুরেন্টের খিচুড়ি খাবেন আশা করি তখন আর বেশি মনে হবে না। সেই সাথে যারা কক্সবাজার যাবেন, যদি এখানে যাত্রা বিরতি করেন অবশ্যই এখানকার খিচুড়ির স্বাদ নেবেন।

অবস্থান

ওকেএম মিডওয়ে ইন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রোডের লোহাগড়ার চুনাতি নামক স্থানে অবস্থিত।

রেটিং

১০/১০

ফিচার ইমেজ: লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here