চট্টগ্রামের সাদিয়া’স কিচেনের চিকেন শর্মা এবং কফি

0
1213

সাদিয়া নামের এক বন্ধুকে প্রায়ই বলতাম, “কী রে সাদিয়া তোর রেস্টুরেন্টে তো একদিনও দাওয়াত করলি না!” বলছি চট্টগ্রামের ‘সাদিয়া’স কিচেন’ রেস্টুরেন্টটির কথা। না, এটি মোটেও আমার বন্ধুর রেস্টুরেন্ট নয়। এমনকি বন্ধুটি চট্টগ্রামেরও নয়। নিছক মজার ছলেই এসব বলতাম। সাদিয়া বলতো, “চট্টগ্রাম গেলেই খেয়ে আসিস, বিল দেয়ার সময় আমার নাম বললেই হবে।”

যদিও এসব ব্যাপার বাস্তবে ঘটেনি বা ঘটবেও না। তবুও এবারের চট্টগ্রাম ট্যুরে ঢুঁ মেরে এলাম সাদিয়া’স কিচেনেও। রেস্টুরেন্টটির নাম কেন সাদিয়া’স কিচেন, ব্যাপারটা বেশ ভাবাচ্ছে। খেয়ে-দেয়ে তাড়াহুড়োয় রেস্টুরেন্টের কাউকে জিজ্ঞেস করে আসতে মনে নেই বিধায় জানার উপায় আপাতত আর নেই। তবে হবে হয়তো রেস্টুরেন্টের মালিক বা তার কোনো প্রিয়জনের নাম সাদিয়া!

সাদিয়া’স কিচেনের একাংশ; Source: লেখিকা

চট্টগ্রাম ট্যুরের আমার সেদিন শেষদিন ছিলো। ট্রেনের টিকেট না পাওয়ায় বাসেই ফিরবো। এ.কে. খান মোড় থেকে বাসে উঠেছিলাম সেদিন। বাস ছিলো রাত ১১:৪৫ এ। সারারাত জার্নি করতে হবে আবার সন্ধ্যা থেকে কিছু খাওয়াও হয়নি। টানা কয়েকদিন ঘুরে পকেটের অবস্থা তখন ভয়াবহ খারাপ। তবুও শেষে কোনো একটি রেস্টুরেন্টের খাবার চেখে আসার নেশা কমে না।

শেষপর্যন্ত হিসেব মিলিয়ে দেখলাম এ.কে. খান মোড় থেকে জিইসি মোড় কাছে হবে, আর সেখানেই সাদিয়া’স কিচেনের একটি শাখা রয়েছে। চট্টগ্রামবাসীদের কাছে সাদিয়া’স কিচেনের খাবার সুস্বাদু এবং সুলভ মূল্যে পাওয়া যায় বলে জনপ্রিয়। আমাদেরও পকেটের অবস্থা শোচনীয় হওয়ায় সাদিয়া’স কিচেনকেই রাতের খাবার খাওয়ার জন্য যথার্থ রেস্টুরেন্ট মনে হলো।

শর্মা এবং সস; Source: লেখিকা

জিইসি মোড় গিয়ে তারপর সাদিয়া’স কিচেনের দোতালায় গিয়ে বসলাম। হাতে তখন অফুরন্ত সময়, বাস ছাড়ার সময় হতে অনেক দেরি। তাই ভাবলাম বেশ কিছু সময় বসে থাকি। কিন্তু ওয়েটারদের দেখলাম প্রচণ্ড তাড়া, আমরা অর্ডার দেয়ার আগপর্যন্ত তিনবার এসে জিজ্ঞেস করে গেলেন কী খাবো! এই ধরনের ব্যবহার বেশ বিরক্তিকর এবং অসম্মানজনকও। তাই ওখানে বসে থাকার সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে চিকেন শর্মা এবং রেগুলার কফির অর্ডার করে দিলাম।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই একজন ওয়েটার শর্মা পরিবেশন করে দিয়ে গেলেন। কফি একটু পর দিতে বললাম, নতুবা ঠাণ্ডা হয়ে যেতো। যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলাম ওখানে আর বেশিক্ষণ বসবো না, তাই খাবারের ছবি নিয়েই খাওয়া শুরু করলাম। এবার খাবারের ব্যাপারে বিস্তারিত লিখছি।

চিকেন শর্মা

চিকেন শর্মা; Source: লেখিকা

আপনি চট্টগ্রামবাসীই হোন বা চট্টগ্রামে ঘুরতে যাবেন, বেশ কম দামে মজাদার শর্মা খেতে চাইলে সাদিয়া’স কিচেনে ঢুঁ মারতেই পারেন। ওয়েটার ফয়েল পেপারে মোড়ানো একদম গরম শর্মা আমাদের পরিবেশ করে দিয়ে গেলেন। ফয়েল পেপারটি ছড়ানোর সাথে সাথে শর্মার সুঘ্রাণ এসে নাকে হানা দিচ্ছিলো। খাবারের এমন সুঘ্রাণ পেয়ে মেজাজ খারাপের কথা মনে থাকলো না। শর্মাতেই মজে গেলাম।

এরাবিক ব্রেড দিয়ে মোড়ানো চিকেনের সাথে মেয়োনিজ আর সসের প্রলেপ, কিছুক্ষণের জন্য শর্মাতেই মনোযোগ ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট। শর্মার মধ্যে চিকেন দিতে একটু কার্পণ্য করেনি রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ। প্রতি কামড়েই সম্পূর্ণরূপে চিকেনের স্বাদ পাওয়া গিয়েছিলো। সাথে রেস্টুরেন্টের সরবরাহ করা স্পেশাল সসটি শর্মাটিকে আরো সুস্বাদু করে তুলেছিলো।

হট কফি

হট কফি; Source: লেখিকা

চট্টগ্রামের কিছু ফুডিজ গ্রুপ এবং দু-একজন চট্টগ্রামবাসীর থেকে সাদিয়া’স কিচেনের কফির বেশ নামডাক শুনেছি। সেজন্যই খাবার শেষ করে কফি পানের সুযোগটিও ছাড়িনি। তবে কফি পানের পর হতাশই হয়েছিলাম বলা যায়। এমনিতে স্বাদ ভালোই, তবে যেভাবে সুনাম প্রচলিত তেমন কিছুই নয়।

একবারেই সাধারণ মেশিনে বানানো কফি যেমন হয়, কফির স্বাদ তেমনই। চিনি আর দুধের পরিমাণ ঠিকই ছিলো। এই কফি পান করে শুধুমাত্র ক্লান্তি কাটবে, তবে কফি পানের তৃপ্তি পাইনি আমি। এরপর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আগে কফির স্বাদ প্রশংসা করাই মতোই ছিলো। ইদানিং কফির স্বাদ আর আগের মতো নেই।

রেটিং

চিকেন শর্মা – ৮/১০
রেগুলার হট কফি – ৬/১০

মূল্য

সাদিয়া’স কিচেনের সুলভ মূল্যই হলো ক্রেতাদের কাছে সবচেয়ে সুবিধাজনক। চিকেন শর্মাটির মূল্য ছিলো মাত্র ৭৯ টাকা আর কফির মূল্য ছিলো ৬৯ টাকা। পাঠকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে আমি এখানে পুরো মূল্য তালিকাটিই সংযোজন করে দিচ্ছি।

মূল্যতালিকা; Source: লেখিকা

পরিবেশ

আমাকে এককথায় সাদিয়া’স কিচেনের পরিবেশ সম্পর্কে বলতে বলা হলে আমি বলবো, বিরক্তিকর। আমি যে শাখাটিতে গিয়েছিলাম সেখানে অল্প জায়গায় ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত টেবিল সাজানো। একেক পর এক চেয়ার টেবিল এমনভাবে সাজানো প্রথম দেখায় রেস্টুরেন্ট নয় বরং এলাকার ভাতের হোটেলের মতো মনে হয়।

সাদিয়া’স কিচেন; Source: লেখিকা

আমি সন্ধ্যাবেলায় যাওয়ায় প্রচণ্ড ভিড় ছিলো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বসার জায়গা পেয়েছিলাম। তবুও ভাগ্য ভালো এক কোণার দিকে খালি টেবিল পেয়েছিলাম। এতটুকু জায়গায় একসাথে এতো ক্রেতা থাকায় শব্দে আমার মাথাব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছিলো। আর যারা রেস্টুরেন্টটিতে খেতে আসেন তারাও বোধহয় জানেন, ওখানে নীরবতা বজায় রাখার তোয়াক্কা কেউ করেন না।

সার্ভিস

ক্রেতাদের কাছে একটি রেস্টুরেন্টের ভালো খাবার এবং ভালো পরিবেশ দুটোর একটিরও কোনো মূল্য থাকে না যদি সার্ভিস খুব খারাপ হয়। আমার মনে হয়েছিলো সাদিয়া’স কিচেন তেমনই একটি রেস্টুরেন্ট। শুরুতেই লিখেছিলাম আমরা বসার পর ওয়েটার বারবার আসছিলেন অর্ডার নিতে। তাকে আমরা বলেও দিয়েছিলাম একটু পর অর্ডার করবো।

আবার শর্মা খেয়ে শেষ করেছি কিন্তু তখনো কফি পরিবেশন করেনি এরমধ্যেই ওয়েটার বিল নিয়ে হাজির। এই ধরনের ব্যবহার আমি প্রথমবার কোনো রেস্টুরেন্টে দেখলাম। এরপর চট্টগ্রামের ফুডিস গ্রুপ ঘেঁটে জেনেছি সাদিয়া’স কিচেনের সার্ভিস সবসময়ই এমন। ওয়েটারদের পেশাদারিত্ব নেই বললেই চলে। এইরকম বাজে সার্ভিসের জন্যই নাকি দিনদিন জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে সাদিয়া’স কিচেন।

লোকেশন

জিইসি শাখা – বাটাগলি, জিইসি মোড়।
চকবাজার শাখা – কলেজরোড, চকবাজার।
আগ্রাবাদ শাখা – বাদামতলি মোড়, আগ্রাবাদ।

Feature Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here