চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুড ট্যুর এবং বিস্তারিত

0
571

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, আমার খুব প্রিয় কিছু জায়গার একটি। প্রথমবার যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম, তখন কাটাপাহাড় আর ঝুপড়িগুলোর প্রেমে পড়েছিলাম। বছর তিনেক পর আবার যাওয়ার সৌভাগ্য হলো। ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে একাই রওনা দিলাম চট্টগ্রামে। গন্তব্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। তবে ঢাকা থেকে একা গেলেও, ওখানে অপেক্ষা করে ছিলো প্রিয় মানুষজন।

ঢাকা থেকে মহানগর প্রভাতী দিয়ে যাদের চট্রগ্রাম যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে, তারা জানেন কতোটা সময় লাগে। ওদিকে ভোরে ঘুম থেকে উঠতে দেরি আর রাস্তার জ্যামে স্টেশনে পৌঁছুতে দেরি হওয়ায়, সকালের নাস্তাও করা হয়নি। সাধারণত যাত্রাপথে ঘুমানোর অভ্যাস না থাকলেও ওইদিন ট্রেনে পুরোটা সময় ঘুমিয়ে যাওয়ায় আর কিছু খাওয়াও হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেট দিয়ে ঢুকেছি, তখন মনে হচ্ছিলো পৃথিবীটা খেয়ে ফেলতে পারবো।

রাতের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; Source: লেখিকা

গেটে বন্ধু অপেক্ষামান ছিলো, গিয়েই বললাম চট্টগ্রাম ভার্সিটি ঘোরার সাথে সাথে একটা ফ্যুড ট্যুরও সেরে ফেলবো। সেটা দুপুর থেকেই শুরু হোক। এরমধ্যে কী কী খাবো, হাঁটতে হাঁটতে ঠিক করে ফেললাম ক্যাম্পাসের কোন কোন জনপ্রিয় খাবার খাবো। সেদিন প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে দুপুরের খাবার থেকেই শুরু করেছিলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড ট্যুরে যা যা খেয়েছি, সব নিম্নে ক্রমানুসারে বর্ণনা করছি।

বিসমিল্লাহ্ হোটেলের ভাত-ভর্তা

তখন পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা, দূরে গিয়ে খাওয়ার প্রশ্নই আসে না। বন্ধু জানায় ১নং গেটের পাশেই শাহ্ আমানত হলের সামনে একটা ভাতের হোটেলের ভাত-ভর্তা বেশ মজা। ওদিকটা আমারো আগে থেকেই চেনা। বেশ কাছেই দেখে ওখানেই চলে গেলাম। যেহেতু ওখানকার ভর্তাই বেশি মজা, তাই শুধু ভর্তা আর ডাল দিয়েই খাওয়া সেরে নিলাম।

বিসমিল্লাহ্ হোটেলের ভাত-ভর্তা; Source: লেখিকা

তখন দুপুর প্রায় শেষ, বেশ কিছু ভর্তা শেষ হয়ে গিয়েছিলো। যে কয়েকটা ছিলো তারমধ্যে থেকে শুটকি ভর্তা আর টাকি মাছের ভর্তা নিলাম। দুটোই আমার খুব পছন্দের ভর্তা। শুটকি ভর্তাটা খেতে অসম্ভব ভালো ছিলো, যদিও ঝাল। টাকি মাছের ভর্তা খুব আহামরি নয়, তবে বেশ ভালোই। তৃপ্তি নিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করার জন্য যথেষ্ঠ।

হোটেল জিলানীর ডিম-খিচুড়ি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাত ভয়ানক সুন্দর। পাহাড়ঘেরা রাস্তাঘাট, সবুজ প্রকৃতি সবকিছুকে অনবদ্য করে তোলে সোডিয়াম লাইটগুলো। ঢাকায় তো এখন আর সোডিয়াম আলো খোঁজেই পাওয়া যায় না। এই সৌন্দর্য লুফে নিতে বিকেলের পরেই বেরিয়ে গেলাম ক্যাম্পাসে। রাত নয়টা পর্যন্ত ঘুরে ফিরে আবার খাবারের সন্ধানে ১নং গেটেই গেলাম।

হোটেল জিলানীর ডিম-খিচুড়ি; Source: লেখিকা

ক্যাম্পাসের বন্ধুরা জানালো শাহ্ আমানত হলের সামনের হোটেল জিলানীর ডিম-খিচুড়ির চেয়ে রাতে খাওয়ার জন্য সেরা আর কিছু নেই। খেতে বসেই বুঝলাম ওরা ভুল কিছু বলেনি। খিচুড়ি এমনিতেই আমার প্রিয় সাথে গরম ডিম ভাজা আর টমেটো ভর্তা নিলাম। আবার মাংসের ঝোলও দিয়ে দেয় সাথে। খেয়ে-দেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বাসার দিকে পা বাড়ালাম।

কলা ঝুপড়ির ডিম-খিচুড়ি

সকালে ঘুম থেকে উঠেই বের হয়ে গেলাম। এদিনটা বরাদ্দ রাখলাম শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই। সাথে ফুড ট্যুরের ব্যাপারটা তো আছেই। সকালের খাবারের জন্য চলে গেলাম কলা ঝুপড়িতে। পরিচিত আর বন্ধুদের কথামতে, কলা ঝুপড়ির ডিম-খিচুড়িই তাদের ক্যাম্পাসের সকালের সেরা খাবার। এসব শোনার পর, আমার তো আর মিস করার প্রশ্নই আসে না!

কলা ঝুপড়ির ডিম খিচুড়ি; Source: লেখিকা

সস্তায় এমন মজাদার খিচুড়ি বা খাবার খাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতেই সম্ভব। এক প্লেট খিচুড়ি, ডিম ভাজা আর সাথে ডালের একটি টিকা নিয়ে নাস্তা করতে বসলাম। খাবার খেয়ে তৃপ্তি পেয়েছি বলার অপেক্ষা রাখে না। আর ঝুপড়ির পরিবেশটুকুই অতিরিক্ত সুন্দর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমে পড়ার আরেকটি যথার্থ কারণ হলো ঝুপড়িগুলো। বন্ধুদের আড্ডা, গান, চা, নাস্তা সবকিছু মিলিয়ে ছোট্টো স্বর্গ ঝুপড়িগুলো।

সিরাজ মামার ফুচকা

দুপুরের খাবার আগের দিনের মতোই বিসমিল্লাহ্ হোটেলেই সারলাম। বিকেল হওয়ার আগেই হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম পেটের আবার খাবার প্রয়োজন। আগে থেকেই সবার সাথে ঠিক করে রেখেছিলাম। লেডিস হলের ঝুপড়ির সিরাজ মামার ফুচকা চেখে দেখবো। শহীদ মিনার হয়ে সেদিকেই চলে গেলাম।

সিরাজ মামার ফুচকা; Source: লেখিকা

ফুচকার ভ্যানের পাশেই লম্বা বেঞ্চ আর কিছু চেয়ার রাখা। আমার চেয়ারের চেয়ে বেঞ্চে বসতেই ভালো লাগে, ওখানেই বসে ফুচকার অর্ডার দিলাম। আমি মিষ্টি টক খাই না, ঝাল টক দিতে বললাম আগে থেকেই। ফুচকাটা বেশ মজা ছিলো, কিন্তু আফসোস এতো ঝাল যে আমি খেতে পারিনি। আপনি ঝাল খেতে না পারলে পরামর্শ থাকবে আগেই ঝাল কম দিতে বলবেন।

অন্যান্য

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আমার সবচেয়ে বিরক্ত লেগেছে চা পান করে। পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে রং চা পাওয়া যায় না। আর দুধ চা যেগুলো পাওয়া যায়, সবই বিস্বাদ। শুধু ১নং গেটের সিপি রেস্টুরেন্টটির পাশের একটি টঙে রং চা পাওয়া যায়। ওই চা পান করে তৃপ্তি পেয়েছিলাম। এখানে ঠিক বিপরীত দিকে শাটলের স্টেশনের ওখানে একজন আনারস, পেয়ারা ইত্যাদি ভর্তা বিক্রি করে। ভর্তাগুলো বেশ মজাদার।

কলা ঝুপড়ি; Source: লেখিকা

আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনদিন থেকে ছিলাম। এরমধ্যে সন্ধ্যায় ঝুপড়িগুলোতে ঘুরে ঘুরে ভাজাপোড়া খেয়ে নাস্তা সেরেছি। এছাড়া শহীদ মিনারের পাশেই পিঠা পাওয়া যায়। এক ভ্যান থেকে পাটিসাপটা পিঠা খেয়েছিলাম, পুর হিসেবে ছিলো শুধু নারকেল কুচি। ভাপা পিঠাও খেয়েছিলাম, ভাপা পিঠাও ভালো লাগেনি।

আমার কোনো হলের ডাইনিঙে খাওয়া হয়নি। বন্ধুরা জানায় কয়েকটি হলের খিচুড়ি বেশ মজা। কলাঝুপড়িতে খুব কম দামে বিরিয়ানি, তেহারি ইত্যাদি পাওয়া যায় এগুলো ভুলেও খাবেন না। ১নং গেটে কিছু ছোটছোট রেস্টুরেন্ট রয়েছে ওদিকেও খেতে পারবেন। আর সিপির চিকেনও পাবেন ওখানেই।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হয়তো খুব আহামরি খাবার পাওয়া যায় না। তবে প্রত্যেকটি ছাত্রের আবেগ জড়ানো নানান খাবার থাকে, যেগুলো তাদের নিত্যদিনের আহার। তাই কোনো ক্যাম্পাসে গিয়ে খেতে চাইলে ক্যাম্পাসের পরিচিতদের থেকে খোঁজ নিন। হয়তো দেখা যাবে, খুব সাধারণ কিছু খাবারের স্বাদও আজীবন মনে থাকবে।

Feature Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here