চাপঘরের জিভে জল আনা কাঁকড়া ভূনা ও সুস্বাদু চিকেন চাপ

0
725

চাপঘরে আমি উদরপূর্তি করেছি বহুবার। ওখানকার দুর্দান্ত চিকেন চাপের প্রেমে প্রথমবারেই ঘায়েল হয়েছিল আমার রসনাপ্রেমী হৃদয়। উদরপূর্তি শেষে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলাম বান্ধবীর কাছে। প্রশংসা শুনে আমার সেই বান্ধবীও বায়না ধরে বসল, সে-ও চাপঘরের চাপ খাবে। কিন্তু বললেই কি আর হয়? আজকাল দু’জনের সময় মিলিয়ে দেখা করাটাও বিরাট ঝক্কির ব্যাপার। অবশেষে সময় মিলল। বান্ধবীকে নিয়ে হাজির হয়ে গেলাম চাপঘরে।

জায়গাটা যেমন

চাপঘর মূলত দুটো অংশে বিভক্ত। ডান পাশে কাপল জোন আর বাম পাশটা ফ্রেন্ড জোন। না! না! ঘাবড়ে যাওয়ার কারণ নেই। কাপল না হলে ডান পাশে ঢুকতে পারবেন না, এমন কোনো নিয়ম নেই। সত্যি বলতে ডান পাশের অংশে বসার জায়গা তূলনামূলক ছোট আর বাম পাশের টেবিলগুলো কয়েকজন মিলে খাওয়া ও আড্ডার দেয়ার জন্যই নির্মিত। তাই ওভাবে জোন ভাগ করে বলা। যেহেতু আমরা মাত্র দুইজন ছিলাম। তাই পদধূলি দিলাম ডান পাশের অংশে।

ভেতরের অংশ বাঁশের দৃষ্টিনন্দন চাঁই দিয়ে ঢাকা। একটা গ্রাম্য অনুভূতি দেয়। টেবিলের ঠিক উপরেই শেড দেয়া আলোকসজ্জাও প্রশংসা পাওয়ার মতো। কেমন একটা ঘোরলাগা হলুদাভ শিখার বিচ্ছুরণ চারদিকে। ফ্যান ঝুলছে দেয়াল থেকে। হাওয়া দিচ্ছে যেন চাপের স্বাদ নিতে আগত খাদকদের ঘাম বের না হয়। কিছুক্ষণ ভেতরের সৌন্দর্য উপভোগ করার পর পেটে মোচড় দিয়ে উঠতেই মনে পড়ল, এখানে তো খেতে এসেছি! ওয়েটার কোথায়?

খাবার খবর

মেনু কার্ডে চোখ বুলিয়ে দুজনের জন্য জাঁকিয়ে খাবার অর্ডার করে দিলাম। দুটো চিকেন চাপ, চারটা লুচি, এক প্লেট কাঁকড়া ভূনা ও দুই গ্লাস লেবু পানি। প্রায় ২০ মিনিট আমাদেরকে ক্ষুধার চাপে রেখে তারপর আরাধ্য খাবারগুলো নিয়ে ওয়েটার টেবিলে হাজির হলো। আমরা আগেই বেসিনে হাত ধুয়ে তৈরি ছিলাম। খাবার সাবাড় করতে শুরু করলাম কালক্ষেপণ না করে।

প্রথমেই লুচি ছিঁড়ে চিকেন চাপ সহযোগে মুখে নিলাম। উম! কী স্বাদ! চোখ বুঁজে এলো। লুচিগুলো বেশ বড়। শাহী লুচি বলা যায়। পরিমিত তেলে ভাজা। চিকেন চাপটিও দুর্দান্ত। ভেতরটা সুন্দরভাবে সেদ্ধ হয়েছে। যথেষ্ট নরম। মশলার পরিমাণও ছিল যথাযথ। সব মিলিয়ে একদম নিখুঁত বলা চলে। নির্বিচারে চাপনিধন প্রকল্প চলল কিছুক্ষণ।

তারপর নজর পড়ল কাঁকড়া ভূনার দিকে। ওটা এখনও অক্ষত রয়েছে কেন? বিনা বাক্যব্যয়ে থাবা বসালাম কাঁকড়ার প্লেটে। লুচির সাথে তুলে নিলাম ভূনা কাঁকড়া। মুখে পোড়ার সাথে সাথে যেন মনটা চনমনে হয়ে উঠল। এর আগেও কাঁকড়া খেয়েছি কিন্তু এত দুর্ধর্ষ স্বাদ তো তখন পাইনি! আপাতত চিকেন চাপকে রেহাই দিয়ে কাঁকড়া বিনাশ প্রকল্পে মন দিলাম।

কাঁকড়ার মচমচে খুলি আর ভেতরে থাকা ঘিলু খেয়ে নিজেকে বেয়ার গ্রিলস বলে কল্পনা করতে মন চাইল। কিন্তু মুখরোচক ভূনা মসলার অতুলনীয় স্বাদের কারণে কল্পনার ঘোড়ায় আর চড়ে বসা হলো না। কাঁকড়ার পা টেনে ধরল আমায়। আমি কুড়মুড় করে কামড়ে দিলাম। পেলাম সামুদ্রিক স্বাদ।

বান্ধবীকে কিছুটা কাঁকড়াভোগের সুযোগ দিয়ে আমি ফিরে এলাম চাপের কাছে। কিন্তু একি! লুচি তো শেষ! ওমা! কাঁকড়ার সাথে লেবু পানিও গায়েব করে ফেলেছি। কোথাকার পানি কোথায় যে গড়ায়! ওয়েটার গেল কোথায়?

অতঃপর আরও দুটো লুচি আর দুই গ্লাস লেবু পানি হাজির করা হলো। অর্ধেক বান্ধবীকে দিয়ে বাকিটুকু নিজেই সাঁটিয়ে দিলাম। চাপ খতম, লুচি হজম! জিহ্বা দিয়ে আঙুল লেহন শেষে, বেসিনে হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত সুন্দর করে ধুয়ে এলাম। টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে বসতে গিয়ে খেয়াল করলাম, আমার প্যান্টটা কোমরে বেয়াদবের মতো খুব করে চেপে বসেছে। কিন্তু বান্ধবীর সামনে তো আর বেল্ট ঢিলা দেয়া যায় না! মান-সম্মানের ব্যাপার। তাই চেপে গেলাম বিষয়টা। বান্ধবীর খাওয়া এখনও শেষ হয়নি। আমি তার খাওয়া দেখছি আর লেবু পানি গলাধঃকরণ করছি। বরফ কুচি দেয়া এই লেবু পানির স্বাদ যেন অমৃত।    

মূল্য মালঞ্চ

পেট তো ভরা হলো। এবার পকেট খালি করার পালা।

চিকেন চাপ প্রতিটি ৮৫ টাকা। ৮৫*২= ১৭০ টাকা।

লুচি প্রতিটি ১০ টাকা। ৬*১০= ৬০ টাকা

কাঁকড়া ভূনা ১২০ টাকা।

লেবু পানি প্রতি গ্লাস ৩০ টাকা। ৪*৩০= ১২০ টাকা

ভ্যাট ১৫%।

মোট খরচার পরিমাণ ৫৪০ টাকা।

রেটিং রঙ্গ

মূল্য ও স্বাদ বিবেচনা করে রেটিং দিচ্ছি।

চিকেন চাপ : ৮/১০

লুচি : ৭/১০

কাঁকড়া ভূনা : ৯/১০

লেবু পানি : ৯/১০

পরিবেশ: ৭/১০; একটু সংকীর্ণ।

সার্ভিস: ৮/১০

ঠিকানা ঠাওর

দেশের যে প্রান্তে থাকুন না কেন, চাপ ঘরে পৌঁছুতে হলে আপনাকে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের আজমপুর (উত্তরা) বাস স্ট্যান্ডে নামতে হবে। সেখান থেকে একটা রিকশা ডাকবেন। ছোট্ট করে বলবেন, “চাপঘরে যাব।” ওতেই হয়ে যাবে। ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে আপনি নিজেকে আজমপুর কাঁচাবাজার সংলগ্ন চাপঘরে হাজির দেখতে পাবেন। রিকশা ভাড়া মাত্র ২০ টাকা।

অবশ্য টাকা বাঁচাতে চাইলে অটোরিক্সায় চড়তে পারেন। সেক্ষেত্রে মাত্র ১০ টাকা খরচা হবে। দেখবেন, রাস্তার বাম পাশে আপনার অপেক্ষায় রয়েছে চাপঘর। আরেকটা বিষয় জানা থাকা জরুরি, চাপঘর বিকেল ৩ টা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ৩ টার আগে বা ১১ টার পরে এলে আপনাকে হতাশার চাপ সইতে হবে। আরেকটি বিষয়- খাদ্যপ্রেমীদের চাপে সাধারণত রাত ৮টার মধ্যে এখানকার চাপ, কাঁকড়া ইত্যাদি শেষ হয়ে যায়। তবে খুশির খবর, এখানে সাপ্তাহিক কোনো বন্ধ নেই। তাই সপ্তাহের যেকোনো দিন নিশ্চিন্তে চলে আসতে পারেন।

এই নাম্বারে (০১৭৪২-১২০০৪৩) কল দিয়ে সিট/স্পেস বুকিং করতে পারবেন যদি আপনার কোনো বড় আয়োজন পরিকল্পনায় থাকে। আপনাদের সুবিধার্থে চাপ ঘরের অফিসিয়াল ঠিকানাটাও দিচ্ছি : আলী হোসেইন প্লাজা, আজমপুর কাঁচাবাজার, উত্তরা, ঢাকা, বাংলাদেশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here