তানজানিয়ার জনপ্রিয় খাবারসমূহ

0
527

তানজানিয়ানরা কাজের শেষে কোনো খোলা বার অথবা রেস্টুরেন্টে মিলিত হতে পছন্দ করেন। এটা তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ। আর তারা যখন কোথাও একসাথে মিলিত হন খাবার সেখানে অপরিহার্যভাবে থাকবেই। ভৌগোলিক কারণে তানজানিয়া ৮ম শতক থেকেই পূর্ব আফ্রিকা, ভারতবর্ষ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট। যার ফলে এখানে বিভিন্ন দেশের মানুষের সম্মিলন ঘটেছে। সেই সাথে বিভিন্ন দেশের খাবার ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে।

ভারতীয়রা ও ইরানিরা তানজানিয়ায় মসলা ও চা নিয়ে গেছেন এবং তারা সেখানে বিয়ে করে নিজেদের দ্বিতীয় বাড়ি বানিয়েছেন। এর ফলে তানজানিয়ার খাদ্যাভ্যাসে ভারত ও ইরানের প্রভাব রয়েছে। তানজানিয়ানরা ‘চায় ইয়া ভিভনঙ্গো’ নামে একধরনের মসলাযুক্ত চা খেতে পছন্দ করেন। এটি তৈরি করার জন্য প্রথমে পানির মধ্যে বেশি করে দুধ দেওয়া হয়। তারপর এর মধ্যে এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি ও আদা দেওয়া হয়। সেখানে এই চা তৈরির প্রচলন ভারতীয়দের হাত ধরেই শুরু হয়েছে।

সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে তানজানিয়ার নিকটবর্তী জানজিবার দ্বীপ ছিল ওমানের রাজধানী এবং সুলতানের বাসস্থান। তবে মূল ভূখণ্ড তানজানিয়া পর্তুগিজদের উপনিবেশ ছিল। এরপর ১৮৮০ সাল থেকে জার্মানদের অধীনে চলে যায়। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জানজিবার দ্বীপসহ সমগ্র পূর্ব আফ্রিকা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৬১ সালে তানজানিয়া ব্রিটিশদের কাছে থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। জানজিবার দ্বীপ তখন তানজানিয়ার অন্তুর্ভুক্ত হয়।

Page #: 70, 71

পর্যটনের জন্য বেশ বিখ্যাত তানজানিয়া; Image Source: travelandleisure.com

ব্রিটিশরা দীর্ঘদিন তানজানিয়াকে শাসন করলেও তাদের সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে পারেনি। কেননা সেখানকার স্থানীয় লোকজন আগে থেকেই ভারতীয় ও আরবীয় খাবারের সাথে অভ্যস্ত ছিল। ব্রিটিশরা তানজিয়ানদের সাথে বিবাহ বন্ধরে আবদ্ধ হননি। তবে তারা সেখানকার জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিল। যেমন তানজানিয়ার স্কুল পড়ুয়া মেয়েরা ব্রিটিশদের কাছে থেকে কেক ও কুকিজ তৈরি করা এবং ছুরি ও কাঁটাচামচের সহায়তায় খাওয়ার পদ্ধতি শিখেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রায় সকল তানজানিয়ান ভারতীয়দের মতো হাত দিয়েই খাবার খান।

তানজানিয়ায় ইউরোপিয়ান ও সোয়াহিলি খাবারের পাশাপাশি ভারতীয় খাবার খুবই জনপ্রিয়। বলা চলে সেখানে ভারতীয় খাবারের বেশ দাপট রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের মতোই সেখানে সামোসা, চা, ভাজা-পুরি, হালুয়া, চাটনি ও বিরিয়ানিসহ আরো অনেক ভারতীয় খাবার। তবে প্রতিটি খাবারেরই তানজানিয়ার নিজস্ব স্বাদ রয়েছে। এবার চলুন তানজানিয়ার কয়েকটি জনপ্রিয় খাবার সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

পোলাও

তানজানিয়ার যেকোনো উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ পোলাও। তবে ভারতের পোলাওয়ের চেয়ে তানজানিয়ার পোলাওয়ে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। তানজানিয়ান পোলাওয়ে মসলার পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে। তবে রান্নার পদ্ধতি ভারতের মতোই। প্রথমে গরম তেলে পেঁয়াজ দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করা হয়। এরপর রসুন, আদা, এলাচ, গোলমরিচ, দারুচিনি ও লবঙ্গ দিয়ে তৈরি পোলাও মসলা দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ নেড়ে বাসমতি চাল দিয়ে পরিমাণমতো পানির সাথে রান্না করা হয়।

তানজানিয়ান পোলাও; Image Source: explorepartsunknown.com

তানজানিয়ার পোলাওতে যেকোনো ধরনের মাংস ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের সি ফুড ও সবজি দেওয়া হয়। সমুদ্রের পাড়ের দেশগুলোর খাবারে কাজুবাদাম ব্যবহার করা প্রবণতা অনেক বেশি। এখানেও পোলাওতে কাজুবাদামসহ আরো বেশ কিছু উপাদান যোগ করা হয়। তবে সবকিছু নির্ভর করে রান্নার পদ্ধতির ওপর।

কাচুমবারি

কাচুমবারি হলো তানজানিয়ার বিশেষ একধরনের সালাদ এবং তানজানিয়ার প্রায় সবধরনের খাবারে সাথেই এই সালাদ পরিবেশন করা হয়। তবে এই সালাদের সাথে উপমহাদেশের সালাদের বেশ মিল রয়েছে। কাচুমবারি সালাদ মূলত বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, টমেটো, লবণ, কাঁচামরিচ এবং লেবু দিয়ে তৈরি করা হয়।

কাচুমবারি; Image Source: explorepartsunknown.com

এই উপাদানগুলো হলো কাচুমবারির মূল উপাদান। এর সাথে অনেকে আবার চিংড়ি, শসা, গাজর ও অ্যাভোকাডো যোগ করা হয়। বর্তমানে অনেকে অলিভ অয়েলও ব্যবহার করেন।

রোস্টেড বানানা

তানজানিয়ার ফুটপাতের খাবার দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় বার ও রেস্টুরেন্টে রোস্টেড বানানা বা ঝলসানো কলা বিক্রি করা হয়। তবে বারগুলোতে এই খাবারটি পরিবেশনের হার অনেক বেশি। চাচান্দু, আচালি ও কাচুমবারির সাথে এই খাবারটি পরিবেশন করা হয়।

রোস্টেড বানানা; Image Source: explorepartsunknown.com

চাচান্দু মূলত তেলে ভাজা পেঁয়াজ, আদা, রসুন, শুকনা মরিচ, টমেটো, লেবু ও লবণ একসাথে ব্লেন্ড করে বানানো হয়। আর আচালি মূলত সোয়াহিলি শব্দ, যা আমাদের দেশের আচারের সমার্থক। যেকোনো ধরনের আচার রোস্টেড বানানার সাথে পরিবেশন করা হয়।

নায়ামা চোমা

এই খাবারটি মূলত মুরগি ও শূকরের মাংস দিয়ে আলাদাভাবে তৈরি করা হয়। প্রথমে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মাংস কেজি দরে কিনতে হয়। এরপর সেই মাংস লেবু, রসুন ও লবণ দিয়ে হালকাভাবে মেরিনেট করে কয়লার আগুনে ঝলসানো হয়। তানজানিয়ায় এই খাবারটি খেতে হলে বেশ সময় নিয়ে রেস্টুরেন্টে যেতে হবে। কারণ এটি তৈরি করতে প্রায় ৪০-৫০ মিনিট সময় লাগে।

নায়ামা চোমা; Image Source: explorepartsunknown.com

শূকরের মাংসের নায়ামা চোমাকে বলা হয় ‘কিটিমো’। শূকরের মাংস প্রথমে কয়লার আগুনে ঝলসিয়ে চাচান্দু ও রোস্টেড বানানার সাথে পরিবেশন করা হয়। এই খাবারটি বড় কোনো রেস্টুরেন্টের চেয়ে রাস্তার পাশের কোনো দোকান থেকে কেনা বেশ লাভজনক। তানজানিয়ানরা মূলত রাতের খাবার হিসেবে কিটিমোতো খেয়ে থাকেন।

ভুনা কলিজা

গরু, মুরগি ও খাসির কলিজা ভুনা তানজানিয়াতে বেশ জনপ্রিয় ও দামি খাবার। স্থানীয় যেকোনো বার ও রেস্টুরেন্টে এই খাবার বিক্রি করা হয়। প্রথমে কলিজা রসুন, লবণ, হলুদ ও মরিচ দিয়ে মেরিনেট করে তেলে ভাজা হয়। এর সাথে ভাজা পেঁয়াজ ও আরো কিছু মসলা দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

উরোজো সুপ (জানজিবার মিক্স)

তানজানিয়াতে সবচেয়ে জনপ্রিয় সুপ উরোজো সুপ বা জানজিবার মিক্স। শুরুতে এই খাবারটি ফুটপাতের দোকানগুলোতে বিক্রি করা হতো। কিন্তু এখন ফুটপাত ছাড়িয়ে বড় বড় রেস্টুরেন্টে জায়গা করে নিয়েছে। জানজিবার মিক্স তৈরি করার জন্য প্রথমে একটি পাতিলে বা কড়াইতে তেল গরম করে তার মধ্যে পেঁয়াজ ও রসুন ভাজা হয়। এর সাথে লবণ, হলুদ (ফুড কালার ও জাফরানও ব্যবহার করা হয়), লেবুর রস এবং গুঁড়া মরিচ দিয়ে একসাথে মেশানো হয়।

উরোজো সুপ; Image Source: explorepartsunknown.com

সব মসলা একসাথে কিছুক্ষণ নেড়ে সামান্য পানি যোগ করা হয় এবং মিশ্রণটি ঘন করার জন্য এক টেবিল চামচ ময়দা মেশানো হয়। অনেকে চুলা থেকে সুপ নামানোর কিছু সময় আগে তেঁতুল অথবা আমের ছোট ছোট টুকরা দেন। এরপর সুপের বাটিতে ঢেলে, সেদ্ধ ডিম, তেলে ভাজা কাসাভা কুচি, নারকেলের চাটনি, কাচোলি, সেদ্ধ আলু, মাংস এবং আরো বেশ কিছু উপাদান দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করা হয়।

ম্যাকেমশো

তানজানিয়া সকালের খাবার হিসেবে ম্যাকেমশো বেশ জনপ্রিয়। এটি মূলত সেদ্ধ মাছ, মুরগি অথবা খাসির মাংস দিয়ে তৈরি একধরনের সুপ। এর সাথে গাজর, কাঁচা কলা, শুকনা মরিচ, গোলমরিচ, রসুন, পেঁয়াজ, আলু, লেবু ও সিলান্টো দেওয়া হয়। এই সুপটি রুটি অথবা চাপাটির সাথে খাওয়া হয়। তানজানিয়াতে অধিকাংশ ব্যাচেলর সকালের খাবার হিসেবে রেস্টুরেন্টে ম্যাকেমশো খেয়ে থাকেন।

Featured Image Source: migrationology.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here