নূরানী কোল্ড ড্রিংস এর লাচ্ছি ও লেবুর শরবত

0
787

যারা চকবাজারের দিকে নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাদের অনেকেই চেনেন বা জানেন ‘নূরানী কোল্ড ড্রিংস’ নামক লাচ্ছির দোকানটি সম্পর্কে। এটি পুরান ঢাকার একটি বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী লাচ্ছির দোকান। রায় সাহেব বাজারের ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘বিউটি লাচ্ছি‘র পরই এই ‘নূরানী কোল্ড ড্রিংস’-এর লাচ্ছির জনপ্রিয়তা।

পুরান ঢাকার ব্যস্ত অংশ চকবাজার এলাকাটি। ঘর সাজানোর সামগ্রী, সাজ-সজ্জার সামগ্রী, খেলনা থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী এখানে পাওয়া যায় পাইকারি দামে৷ রয়েছে অসংখ্য কারখানা। এ এলাকাটিতে তাই অনেক বেশিই ভিড় থাকে সারাদিন। তবে বেচা-কেনার পাশাপাশি আলাদা একটি ভিড় চোখে পড়বে এই নূরানী কোল্ড ড্রিংস নামক লাচ্ছির দোকানটির সামনে।

দোকানের ভেতর; source: লেখিকা

আশেপাশের এলাকাবাসীর প্রিয় জায়গা এটি। তাই শুধু এখানকার দোকানী কিংবা এখান থেকে বিভিন্ন সামগ্রী কিনতে আসা লোকজনই নয়, এলাকাবাসী ও দূর দূরান্ত থেকে অনেকেই আসেন এই লাচ্ছির টানে। ১১৮ নং চকবাজারের গলিতে ঢুকতেই আপনার নজর কাড়বে রাস্তার পাশের ভিড়।

বিউটি লাচ্ছির পর পুরান ঢাকার সবচেয়ে পুরনো লাচ্ছির দোকান এটি। এখানে পাওয়া যায় ২ রকমের লাচ্ছি (নরমাল লাচ্ছি ও স্পেশাল লাচ্ছি) আর লাচ্ছির পাশাপাশি ২ রকমের লেবুর শরবত (নরমাল লেবুর শরবত ও স্পেশাল লেবুর শরবত)।

লাচ্ছি ও শরবতের জন্য বরফ ভাঙ্গার স্থান; source: লেখিকা

দোকানটির সামনে দাঁড়ালেই দেখা যায় লাচ্ছি ও লেবুর শরবত তৈরি করতে। সবার সামনেই তৈরি করা হয় এখানকার লাচ্ছি ও লেবুর শরবত। একপাশে দাঁড়িয়ে শরবত ও লাচ্ছির জন্য বরফ প্রস্তুত করেন একজন ও আরো দু’জন কাছে বসেই তৈরি করেন লাচ্ছি ও শরবত।

লাচ্ছি তৈরিতে ব্যবহার করা হয় দই, চিনি, পানি ও বরফ। লেবুর শরবত তৈরিতে লেবু, চিনি, লবণ ও বরফ। দোকানের সামনে বসে বেশ দ্রুততার সাথে নিজেদের কাজ করতে থাকেন দু’জন। তাদের এ কাজের দক্ষতা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন তাদের কাজ দেখে।

লাচ্ছি ও শরবত তৈরির স্থান; source: লেখিকা

দোকানটির সামনে প্রায় সবসময়ই ভিড় লেগে থাকে। ভেতরে বসার ব্যবস্থা রয়েছে। মোটামুটি বড় ২টি ভাগে সোফা রেখে ভেতরে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে ২০ থেকে ২৫ জনের মত বসতে পারে। তবে ভেতরের আসনে বেশ চাপাচাপি করে বসেও অনেককেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বাহিরে।

ভেতরে বসে খেতে হলে আগেই টাকা দিয়ে অর্ডার করতে হয়। লাচ্ছি বা লেবুর শরবত তৈরি হয়ে আসতে খুব বেশি সময় লাগে না। আর আপনি সাথে নিতে চাইলে ক্যাশ ডেস্কে টাকা জমা দিয়ে টোকেন নিতে হবে। এই টোকেন বাহিরে নিয়ে জমা দিলেই লাচ্ছি পেয়ে যাবেন। সেক্ষেত্রে লাচ্ছি বা শরবত পলিথিনের প্যাকেটে দেয়া হয়।

লাচ্ছি ও শরবত তৈরি; source: লেখিকা

বহু প্রশংসা শোনায়, বিউটি লাচ্ছির পর এবার চলে গেলাম নূরানী কোল্ড ড্রিংসের লাচ্ছি ও লেবুর শরবতের স্বাদটি চেখে দেখতে৷ ব্যস্ত চকবাজার, সন্ধ্যার ভিড় ঠেলে গিয়ে দাঁড়ালাম নূরানী কোল্ড ড্রিংস দোকানটির সামনে। দোকানের ভেতরে ও বাহিরে তখন প্রচন্ড ভিড়। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সুযোগ পেয়েই ঢুকে পড়লাম ভেতরে।

ভেতরে বামপাশে দোকানটির ক্যাশ ডেস্ক। একবার দাম দেখে নিলাম সামনের দেয়াল থেকে। স্পেশাল লাচ্ছি ৪০ টাকা, নরমাল লাচ্ছি ৩০ টাকা ও লেবুর শরবত ২০ টাকা। ক্যাশিয়ারের কাছে টাকা জমা দিলাম একটি লাচ্ছি ও একটি লেবুর শরবতের। গিয়ে বসতে বসতেই চলে এলো লাচ্ছি ও লেবুর শরবত।

অর্ডারের জন্য টাকা জমা দেয়ার স্থান; source: লেখিকা

কিছুদিন আগেই গিয়েছিলাম পুরান ঢাকার জনপ্রিয় ও ১০০ বছরের মত সময় ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী বিউটি লাচ্ছিতে। এবারের নূরানী কোল্ড ড্রিংস দোকানটির লাচ্ছি ও লেবুর শরবতের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে মনে হলো এখানকার ও বিউটি লাচ্ছির লাচ্ছি ও লেবুর শরবতের স্বাদ অনেকটাই একই রকম। সেই একই ঘ্রাণ, একই স্বাদ। বেশ ভালো লাগলো। পুরান ঢাকার মত এতো মজাদার লাচ্ছি আর কোথাও পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

বেশি ভালো লেগেছে লেবুর শরবত। লেবুর শরবত শুনলেই অনেকের কাছে খুব সাধারণ একটি পানীয় মনে হতে পারে, তবে এখানকার লেবুর শরবত কিছুটা আলাদা অন্যান্য জায়গার কিংবা নিজেদের তৈরি করা লেবুর শরবতের তুলনায়। এই ‘কিছুটা আলাদা’ হওয়ার পেছনের কারণটা আমার ঠিক জানা নেই।

স্বাদ

লাচ্ছি ও লেবুর শরবত; source: লেখিকা

একেবারেই আলাদা স্বাদ পাবেন এখানকার নরমাল লাচ্ছি ও লেবুর শরবত উভয়ের মধ্যেই। বেশ মজাদার দুটি পানীয়। প্রচন্ড গরমে একেক গ্লাস ভর্তি অনেকটা স্বস্তি ও শান্তি। এখানকার লাচ্ছি ও লেবুর শরবতে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি উপকরণই খুব ‘পারফেক্ট’ লেগেছে। প্রিয় পানীয়ের তালিকায় তুলে রাখার মত স্বাদ।

মূল্য

লেবুর শরবত; source: লেখিকা

স্পেশাল লাচ্ছির মূল্য ৪০ টাকা৷ নরমাল লাচ্ছি ৫০ টাকা ও লেবুর শরবত ২০ টাকা। অল্প টাকায় অধিক স্বাদের পানীয় বলা চলে।

একটি লাচ্ছি ও একটি লেবুর শরবত বাবদ আমার সেখানে খরচ করতে হয়েছে মাত্র ৫০ টাকা।

পরিবেশ

নরমাল লাচ্ছি; source: লেখিকা

ব্যস্ত চকবাজারের ভেতরে দোকানটি। খুব বেশি সাজ-সজ্জা নেই ভেতরের৷ সাধারণ, ছোট্ট একটি দোকান। ভেতরে অল্প সংখ্যক মানুষের বসার সুযোগ রয়েছে। বাহিরের দিকে তৈরি করা হয় পানীয়গুলো। এখানে আপনি বড় বড় রেস্টুরেন্টের মত পরিবেশ খুঁজলে হতাশ হবেন। প্রচন্ড ভিড়, শোরগোল, চেঁচামেচির শব্দ পাবেন পুরো এলাকায় ও দোকানটিতেও।

লোকেশন

১১৮ নং চকবাজারে পৌঁছালে সহজেই চোখে পড়বে দোকানটি। তবে যদি কোনোভাবে খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়, তবে চকবাজার এলাকায় পৌঁছে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দিবে বিখ্যাত এই নূরানী কোল্ড ড্রিংসের দোকানটি।

ফিচার ইমেজ- লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here