প্রিয় মেজবানের মেজবানি সেট মেন্যু-১

0
445

مهمان ( Mehmaan) একটি ফার্সি শব্দ এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Guest আর বাংলায় সঠিকতম শব্দটি হবে ‘অতিথি’। কিন্তু একজন অতিথি যার বাসায় যাবেন তাকে কী বলা হবে?

কী ভাবছেন? বিপদে পড়ে গেলেন নাকি? আসলে শব্দটি ঘুরে ফিরে আমরা সবাই জানি কিন্তু নির্দিষ্টভাবে কোন শব্দটি হবে সেটি অনেকেই হয়তো জানি না। যার ঘরে অতিথি হয়ে মেহমান যাবে তাকে বলা হবে ‘মেজবান’। এটিও একটি ফার্সি শব্দ ميزبان – ‘ ( Mezbaan) যাকে ইংরেজি পরিভাষায় Host বলতে হয়। আর অতিথিপরায়ণতাকে বলা হয় ‘মেজবানি’।
পাঠকরা এতক্ষণে বিরক্ত হয়ে গিয়েছেন যে মেজবান নিয়ে এত কথা কেন?

জি, বলছি এবার। সেদিন খেতে গিয়েছিলাম ‘প্রিয় মেজবান’ নামের এক রেস্টুরেন্টে। আমি ও আমার বন্ধু দু’জনেই মিরপুরবাসী হওয়ায় মিরপুর-৬ এর এই রেস্টুরেন্টটিতে ঢুঁ মেরে এলাম দুপুরে খেতে। চট্টগ্রামের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী শাহী মেজবান খাবার ঢাকায় বসে খেতে কে না চাইবে? এত সুস্বাদু প্রক্রিয়ায় বানানো রেসিপি দেখে আমি সত্যিই উচ্চাশা নিয়ে গিয়েছি সেখানে। যেহেতু আমরা মেহমান তাই তাদের কাছে থেকে পাওয়া মেন্যুকার্ড উল্টে-পাল্টে মেজবানি সেট মেন্যু-১ অর্ডার করেছি। আর সাথে সাদা ভাত অর্ডার করেছি। আমরা দু’জন ছিলাম বলে একটি এক্সট্রা সাদা ভাত সাথেই দিতে বলেছিলাম।

একটি বিচিত্র ঘটনার কথা না বললে আমাদের এই রেস্টুরেন্টে আসার ঘটনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমরা হাত-মুখ ধুতে গিয়েছি বেসিনে। জীবনের প্রথম এত গরম পানি দিয়ে হাত ধুয়েছি যে হাতে লাগার পর কেমন একটা শক খেতে হয়েছে। আমার বন্ধুটি নল খুলেই মুখে পানি ছিটিয়ে ছিল। আহা! বেচারী! মুখ জ্বলে যাওয়ার দশা! রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলে তারা জানায়, প্রচন্ড গরমের কারণে তাদের রিজার্ভ ট্যাংকও গরম হয়ে গিয়েছে। আমাদের হাত-মুখ ধোবার জন্য কোন বিকল্প ব্যবস্থাও নেয়নি তারা। তাদের নাকি কিছু করার নেই। শেষমেশ ঘেমে-টেমে এসে একগাদা টিশ্যু পেপার নিয়ে হাত-মুখ মোছা শুরু করেছি। অর্ডার দিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম অন্তত যেন খাবারগুলো ভালো হয়।

যা-ই হোক, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলাম এই ‘মেজ্জান’ বা মেজবানের ইতিহাস নিয়ে। মেজবান চট্টগ্রামের একটি পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে এখনো টিকে আছে। আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে চট্টগ্রামের জমিদার শমসের গাজী তার মায়ের নামে একটি দীঘির খননকাজ শেষে একটি ভোজের আয়োজন করেন। এজন্য তিনি সেই দীঘিসহ আশেপাশে বিভিন্ন অঞ্চলের দীঘি থেকে মাছ নিয়ে এসে মাছ দিয়ে প্রথম মেজবান করেন। তৎকালীন সময়ে বহু হিন্দু পরিবার সেখানে বসবাস করতো। তারা নিজেরা মাছ, সবজি ও শুঁটকি দিয়ে মেজবান করে খেতো। চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চলে ছাগলের মাংস দিয়ে এখনো মেজবান রান্না করা হয়। মূলত এ মেজবানের প্রধান আকর্ষণ গুলো হলো এখানে প্রচুর ঝাল ও মশলা দিয়ে রান্না করা গরুর মাংস থাকে। এছাড়াও কম ঝাল, টক ও মশলা দিয়ে রান্না করা গরুর নলা বা শুরুয়া যাকে ‘নলা-কাজি’ বলা হয়; সেই আইটেমটিও থাকে। এর সাথে বুটের ডাল, হাড়, চর্বি ও মাংস সমন্বিত হাল্কা ঝালে তৈরি একটি খাবার থাকে।

গল্পের এক ফাঁকে আমার বন্ধুটি আমাকে জানালো চট্টগ্রামে গিয়ে সে একবার মেজবান খেয়েছিল। সেই মেজবানে সে গরুর নলার মাংস দিয়ে খুব স্বাদ করে খেয়েছিল। খুবই টেস্টি হয়েছিল সে খাবার। সেখানে যে বুটের ডাল ছিল সেটা নাকি আরো অতুলনীয়। বন্ধুটির কথা শুনে ক্ষুধা একেবারে চড়কগাছে গিয়ে উঠবার দশা।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা শেষেই এলো কাঙ্ক্ষিত সেই খাবার। খাবার দেখে আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না। প্রথম দর্শনে মোটামুটি দেখতে ছিল। তাই ব্লগের জন্য ফটাফট কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম।

মেজবানি সেট মেন্যু-১; সোর্স: লেখক

এরপর সাদাভাত দিয়ে অল্প করে ডাল ও মাংস নিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। আমি খেয়ে কোনভাবেই আহামরি কোন স্বাদ পেলাম না। সত্যিকার অর্থে বাসায় আমাদের মায়েরা যেভাবে মাংস রান্না করে তার চেয়েও কম স্বাদ ছিল (আমার টেস্ট বাড অনুযায়ী)। সবচেয়ে হতাশ হয়েছি বুটের ডালের অংশটিতে। বলতে গেলে রীতিমতো শকড। একটি মাংসও নেই সেখানে। মাংস তো দূরে থাক চর্বিও নেই। একটা ছোট্ট অখাদ্যকর হাড় ছিল। ছবিতে দৃশ্যমান উপরে যেটা ভেসে আছে, সেটা।

বিস্বাদ বুটের ডাল!; সোর্স: লেখক

কিছুক্ষণ পর মাংসের বাটিতে মাংসের পরিবর্তে চর্বি পেলাম এক টুকরো। এক টুকরো পেলাম মাংস ছাড়া শুধু হাড়। আর ছোট তিনটি টুকরো পেলাম মাংসের।

এক টুকরো চর্বি, এক টুকরো হাড়, আর ৩ টি ছোট টুকরো নিয়ে ভাসমান তেল যুক্ত মেজবানি মাংস; সোর্স: লেখক

আমরা দু’জনেই কষ্ট করে খেতে শুরু করেছি। সালাদ তুলে নিয়ে কামড়াচ্ছি তখন। খেয়াল করলাম তাদের দেওয়া সালাদে শসাগুলো শুকনো হয়ে গিয়েছিল। খেয়ে মনে হয়েছে সেটি অনেক আগে কাটা। টাটকা বা ফ্রেশলি এখন কাটা না। আমাদের দু’জনের মুখেই কোন কথা নেই। কী আশা করেছি আর কী পেলাম! মাংসের বাটিতে সামান্য কিছু ঝোলসহ ছিল শুধু ভাসমান তেল। আমাদের খাবারের জন্য ওয়েটারকে জানালাম একটু ঝোল দিতে। অবাক করা বিষয়টি হলো তাদের কোন এক্সট্রা ঝোল দেবার ব্যবস্থা নেই। বাহ! বাহ!

পুরো সেট মেন্যুটিতে একটি ড্রিঙ্কস ছিল। আমাদের মনে হয়েছে এই ড্রিঙ্কসটাই বেস্ট খাবার এই সেট মেন্যুটিতে। কষ্ট করে টাকার মায়া করে কিছুক্ষণ খেয়ে পরে ঝোলের অভাবে পুরো খাবার আমরা শেষ করতে পারিনি।
একটা সময় মনের ভেতর এই অনুভূতির সঞ্চার হয়েছিল যে, এই রেস্টুরেন্টটি আমাদের মতো কাস্টমারদের সাথে প্রতারণা করছে। মেজবানের নামে তারা জাস্ট গরুর মাংস, রাস্তার ধারের যেকোন ছোট হোটেলগুলোতে সকালের নাস্তায় যে বুটের ডাল দেয় সে বুটের ডাল খাওয়াচ্ছে। এর ঐতিহ্যবাহী নামের সাথে খাবারের বিন্দুমাত্র মিলও নেই। সবমিলিয়ে একটি বিরাট হতাশায় ছিলাম আমরা।

খাবার

এর খাবারকে মার্কিং করতে গেলে নাম্বার দেবার জায়গা নেই। তবে সাদা ভাত ও কোল্ড ড্রিংক্সের জন্য ১/১০ পেতে পারে।

স্বাদ

উপরের বর্ণনা শুনে ইতোমধ্যেই পাঠকরা বুঝে গেছেন যে কীরকম স্বাদ ছিল আর এর নাম্বারই বা কত দেওয়া যায়। ২/১০ দেওয়া যায় ৩ টুকরো মাংসের জন্য। ঝাল, মসলা আরো একটু থাকলে ভাল হতো।

সার্ভিস

বেসিনে অত্যন্ত গরম পানি ছিল হাত-মুখ ধুতে গিয়ে সেটা টের পাই। সেটা জানালেও কোন পদক্ষেপ নেয়নি। আর ঝোল চেয়েও পাইনি। এটা অবশ্য তাদের রেস্টুরেন্টের একটি বাজে দিক। বিল নেবার সময় একবার পানির বোতলের মূল্য যোগ করতে ভুলে গিয়েছিল। পরবর্তীতে আবার আমাদের কাছে রিসিট ফেরত চেয়ে ঠিক করে আনে। এসবই তাদের চূূড়ান্ত আনপ্রফেনালিজমের সাক্ষ্য বহন করে।

পরিবেশ

এত খারাপ খাবার পাবার পরেও স্বীকার করতে হবে যে তাদের ভেতরের পরিবেশ খুবই সুন্দর, ছিমছাম ও গোছানো ছিল। তাদের ডেকোরেশন খুবই চমৎকার।

ইন্টেরিয়রের একাংশ; সোর্স: লেখক

মূল্য

এই সেট মেন্যুটির দাম ছিল ২৬০ টাকা। একটি এক্সট্রা সাদা ভাত নিয়েছিলাম যার মূল্য ৩৫ টাকা। একটি ছোট পানিসহ  মোট বিল এসেছে ৩১০ টাকা।

মূল্যমানের রিসিট; সোর্স: লেখক

স্থান

কেউ যদি মেজবানের নামে প্রতারিত হতে চান, তাহলে তার জন্যে জায়গার ঠিকানাটি দিয়ে দিচ্ছি। হাউজ নং ১/২, এভিনিউ-৫, ব্লক-এ, মিরপুর-৬, ঢাকা-১২১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here