ফতেয়াবাদের ব্লু হিল রেস্টুরেন্টের খাবার-দাবার

0
548

চট্টগ্রাম শহরের কাছেই অবস্থিত ভাটিয়ারী ইউনিয়ন অসম্ভব সুন্দর একটি এলাকা। পাহাড় এবং সমুদ্রে ঘেরা এই ইউনিয়নটি ভ্রমণপিপাসুদের তীর্থস্থান। বিশেষ ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ভাটিয়ারী সানসেট পয়েন্ট জায়গাটিতে প্রতিদিনই ঘুরতে যান অসংখ্য মানুষ। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এই সানসেট পয়েন্টে বসে সমুদ্র, পাহাড় এবং সূর্যাস্ত একই সাথে উপভোগ করা যায়।

ভাটিয়ারী সানসেট পয়েন্টে যাবার ইচ্ছে ছিলো আমার অনেকদিনের। এবার চট্টগ্রাম ট্যুরে গিয়ে ইচ্ছে পূরণ করেও ফেললাম। সেদিন আবার বন্ধুর জন্মদিনও ছিলো। সূর্যাস্তের পর ভাটিয়ারী সানসেট পয়েন্ট থেকে বের হয়ে বন্ধু জানালো আমাদের জন্মদিনের ট্রিট দিবে। আশেপাশে কেমন রেস্টুরেন্ট আছে কিছুই জানি না। আবার, চট্টগ্রাম শহরে যাওয়াও তখন সম্ভব নয়।

তখনই আরেক বন্ধু জানালো, ফতেয়াবাদ দিয়ে যাওয়া-আসার সময় “ব্লু হিল” নামের একটি রেস্টুরেন্ট দেখেছে। তবে খাবারের মান কেমন, জানা নেই তার। আর কোনো উপায় না থাকায় ব্লু হিলের দিকেই রওনা দিলাম। বেশিক্ষণ লাগলো না পৌঁছুতে। রেস্টুরেন্টটি রাস্তার পাশেই একটি বিল্ডিঙের দোতালায় অবস্থিত। সিঁড়ি বেয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকে গেলাম।

ব্লু হিল রেস্টুরেন্ট; Source: Blue Hill

প্রবেশ করার পর রেস্টুরেন্টটির সাজসজ্জা দেখে মনে হলো খাবারের মান হয়তো খারাপ হবে না। তবে নিশ্চিতও হওয়া যায় না। এছাড়া আমরা ছাড়া তখন তেমন কোনো ক্রেতাও ছিলো না। অথচ, সন্ধ্যাবেলায় যেকোনো রেস্টুরেন্টে ভীড় লেগে থাকে। তখন আর এতোকিছু ভেবেও লাভ নেই। সবাই মিলে একটি টেবিলে বসে গেলাম।

বসার পর ওয়েটার মেন্যুকার্ড দিয়ে গেলেন। আমরা মেন্যু দেখে সবাই কি খাবো ঠিক করলাম। আমরা চারজন ছিলাম। এরমধ্যে দুু’জন নিলাম চিকেন চাপ আর নানরুটি, একজন দেশি সেট মেন্যু এবং আরেকজন চাইনিজ সেটমেন্যু। পনের মিনিটের মতো অপেক্ষা করার পর ওয়েটার খাবার পরিবেশন করলেন। এবার খাবারের ব্যাপারে বিস্তারিত লিখছি।

চাইনিজ সেটমেন্যু

চাইনিজ সেটমেন্যু; Source: লেখিকা

ব্লু হিল রেস্টুরেন্টে চাইনিজ সেটমেন্যু আছে দুইটি। এরমধ্যে আমরা ১নং সেটমেন্যুটি নিয়েছিলাম। মেন্যুটিতে ছিলো ফ্রায়েড রাইস, মিক্সড ভেজিটেবল, চিকেন ফ্রাই দুই পিস এবং সালাদ। খাবার পরিবেশন করার পর চাইনিজ সেটমেন্যু দেখেই অনেকটা আন্দাজ করে নিলাম খেতে কেমন হতে পারে।

ফ্রায়েড রাইস ছিলো অনেকটা বাড়িতে সবজি দিয়ে ভাজা ভাতের মতো দেখতে আর চিকেন ফ্রাই শুকনো খটখটে। সারাদিন ঘুরে আমাদের যথেষ্ঠ ক্ষুধাও ছিলো। খাবার যেমনই হোক তখন খেতে হবেই। ফ্রায়েস রাইস আসলেই অনেকটা ভাতের মতো লেগেছে, ঠিকমতো ভাজা ছিলো না। চিকেন ফ্রাইয়ের স্বাদ ছিলো শুধু বেসনে ডুবিয়ে ভাজা মুরগির মাংসের মতো।

আসলেই ফ্রাই করেছিলোও শুধু বেসনে ডুবিয়ে। চিকেন ফ্রাইয়ের ক্রিস্পি বা ক্রাঞ্চি স্বাদের কোনোটিই বিদ্যমান ছিলো না। মিক্সড ভেজিটেবলের স্বাদ মোটামুটি ভালো ছিলো। তবে ফ্রায়েড রাইসের পরিমাণ অনেক, একজনে খেয়ে সহজে শেষ করতে পারবে না।

চিকেন চাপ এবং প্লেইন নান

চিকেন চাপ; Source: লেখিকা

চাইনিজ সেটমেন্যুটির মতো চিকেন ফ্রাই দেখেই হতাশ হতে হয়নি। চিকেন চাপ বা নানের কোনোটিই দেখতে খারাপ ছিলো না। আমি আমার জন্য চিকেন চাপ নিয়েছিলাম। প্রথমে সেটমেন্যু নিতে চেয়ে না নেয়ায় নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে হচ্ছিলো। যাইহোক, খাওয়া শুরু করে দিলাম। চিকেন চাপ খেতে খারাপ লাগেনি।

চিকেন চাপটি ভালোভাবেই ভাজা ছিলো। তবে প্রচুর মশলাদার এবং ঝাল। ভাজার তেল প্লেটে ছিলো, যা দৃষ্টিকটু এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকরও। আমি খাওয়া শুরু করার আগে টিস্যু দিয়ে প্লেট থেকে তেল সরিয়ে নিয়েছিলাম। মাংসের পিসটিও বেশ বড় ছিলো।

ব্লু হিলের খাবারের মান মোটামুটি হলেও পরিমাণের ব্যাপারে বেশ উদার। চিকেন চাপের মাংসের পিসটি যেমন বড় তেমনি প্লেইন নানও। একটি নান আমি খেয়ে শেষ করতে পারিনি। নানরুটির স্বাদ বেশ ভালো লেগেছিলো। প্লেইন নানেও হালকা ঘিয়ের ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম।

দেশি সেটমেন্যু

দেশি সেটমেন্যু; Source: লেখিকা

ব্লু হিল রেস্টুরেন্টের তিনটি আইটেমের মধ্যে দেশি সেটমেন্যুটির স্বাদই সবচেয়ে ভালো ছিলো। মেন্যুটিতে ছিলো সাদা ভাত, ডিম ভর্তা, চিকেন কারি এবং ডাল। আমাদের মধ্যে একজনের ভাত খুব পছন্দ, তাই সে এই মেন্যুটি নিয়েছিলো। শেষপর্যন্ত বন্ধুর ভাতের মেন্যু শুধু চেখে না দেখে, ভাগই বসিয়েছিলাম।

ডিম ভর্তাটি ডিম না চটকে কুচিকুচি করে কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে করা হয়েছিলো। সাধারণ ডিম ভর্তার চেয়ে একটু আলাদা স্বাদ পেয়েছিলাম। মুরগির মাংসের কারির স্বাদ একবারেই সাধারণ মানের। মাংসের বেশ বড় দুইটি পিস ছিলো। মসুর ডালও বেশ সুস্বাদু ছিলো। এই দেশি মেন্যুটিতেও ভাতের পরিমাণ ছিলো অনেক।

রেটিং

চাইনিজ সেটমেন্যু – ৪/১০
চিকেন চাপ, প্লেইন নান – ৬/১০
দেশি সেটমেন্যু – ৭/১০

মূল্য

ব্লু হিল সুলভ মূল্যেই ক্রেতাদের কাছে খাবার সরবরাহ করে।চাইনিজ সেটমেন্যুটির মূল্য ছিলো ১৬০ টাকা, চিকেন চাপ ১২০, প্লেইন নান ২০ এবং দেশি সেটমেন্যুটির মূল্য ১৯০ টাকা। এখানে ব্লু হিলের পুরো মূল্যতালিকাটিও সংযোজন করছি।

মূল্যতালিকা; Source: Blue Hill

পরিবেশ এবং সার্ভিস

ব্লু হিল রেস্টুরেন্টটির পরিবেশ নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ বা খারাপ লাগা নেই। বরং, ফয়েতবাদের মতো জায়গা অনুযায়ী বেশ ছিমছাম একটি রেস্টুরেন্ট। সাজসজ্জায় কালো কাঠ এবং দেয়াল চিত্রের মাধ্যমে বেশ নান্দনিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। আলোজসজ্জা ধরণও বেশ সুন্দর।

রেস্টুরেন্টটির নান্দনিকতা; Source: Blue Hill

পুরো রেস্টুরেন্টটিই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। বসার জন্য কাচের টেবিলের সাথে গদিওয়ালা সোফা এবং চেয়ার। রেস্টুরেন্টটি তেমন জনবহুল না হওয়ায় আরাম করে অনেকক্ষণ বসে আড্ডা দিয়ে সময় কাটানো যাবে। প্রত্যেকটি টেবিলই সুন্দর করে সাজানো ছিলো। ব্লু হিলকে সাধারণ মানের নান্দনিক রেস্টুরেন্ট বলা যায়।

রেস্টুরেন্টটির সার্ভিস খুবই সাধারণ মানের। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন ক্রেতা একদমই ছিলো না। তারপরেও ওয়েটারদের তৎপরতা লক্ষ্য করিনি। একজনকে কোল্ড ড্রিঙ্ক দিতে বলার কিছুক্ষণ পর উনি জানান ভুলে গিয়েছিলেন! আসলে রেস্টুরেন্টটি নতুন হওয়ায় ওয়েটারগণ এখনো সেভাবে পেশাদার হতে পারেননি।

Feature Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here