বনলতা কফিশপের বিখ্যাত সিচুয়ান স্যুপ ও সুস্বাদু স্পেশাল ওন্থন!

0
342

প্রবাদে আছে, ভালো খাবার মানুষের মন ভালো করে দেয়। সেদিন আমার মন কেমন ছিলো তা আপাতত না জানাই থাক, কিন্তু এই বনলতার স্যুপ খেয়ে কেউ হতাশ হয়েছেন এমন মানুষ হয়তো খুব কমই পাওয়া যাবে। আমিও এক পড়ন্ত বিকালে বন্ধুকে নিয়ে বনলতা কফি শপের প্রধান শাখায় (মিরপুর সাড়ে এগারোর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন) খেতে গিয়েছিলাম। সহজ রাইডে করে এসেছিলাম বলে বাসা থেকে অনেক তাড়াতাড়িই এসেছিলাম। বন্ধু আসতে দেরী করছিলো বিধায় কী খাবো তা অর্ডার করিনি।

বন্ধু চলে আসার পরপরই দু’জনই মেন্যু চষে খোজতে লাগলাম কি খাবো। এরপর রাইস সহ আলাদা আলাদা কারি মেন্যুগুলো খাবো নাকি চাওমিন খাবো অথবা নতুন কিছু বিভিন্ন খাবারের প্রসঙ্গ উঠছিলো। শেষ নতুন কিছু খাবো এই ভেবে ৬ পিস ফ্রায়েড ওন্থন ও সিচুয়ান স্যুপ ১ঃ২ অর্ডার করবো ভাবছিলাম। কিন্তু খাবারটি কেমন হবে তা নিশ্চিত হতে পারছিলাম না বলে ওয়েটারকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম তা খেতে কেমন হবে। ওয়েটার বলছিলো সেটি খুব সসি হবে এবং উপর দিয়ে চাল ভাজা ছড়িয়ে দেওয়া থাকবে। ‘এত ভেবে কাজ নেই অর্ডার দিয়ে একবার খেয়েই দেখি’-টাইপের চিন্তাধারা নিয়ে অর্ডার করে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষায় ছিলাম।

গল্প চলছে আমাদের। এরই একফাঁকে এসে স্যুপের বাটি সাজিয়ে দিয়ে গেলেন একজন ওয়েটার। তার কিছুক্ষণ পর বড় বাটিতে করে স্যুপ দিয়ে গেলেন। প্রথম দেখায় কেমন লেগেছিলো সে কথায় আসি। মোটামুটি একটি বড় বাটিতে করে স্যুপ সাজিয়ে দেওয়া ছিলো। উপরে আতপ চাল ভাজা ছড়িয়ে দেওয়া ছিলো যেমনটা আমরা পোলাও রান্না শেষে পেয়াজের বেরেশতা ছড়িয়ে দিই।

খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম বলে ততক্ষণাৎ ছবি তোলার কথা মাথায় আসেনি। স্যুপ বাটিতে করে ঢেলে ফেলার পর মনে হয়েছে ছবির কথা। বার কয়েক ছবি তুলবার চেষ্টা করলাম। আলো কম থাকায় খুব একটা ভালো আসেনি। এরপর চামচে করে কিছুটা নিয়ে ক্লোজ শট দিয়ে দেখলাম কেমন আসে। বারকয়েক তোলবার পর শেষমেষ ক্ষান্ত দিলাম। ওন্থনটাকে মাঝখান দিয়ে ভেঙে ভেতরের কিমাটুকু দেখানোর প্রচেষ্টা চলছিলো সাথেই।

মাংসের কিমাযুক্ত স্পেশাল ওন্থনের ক্লোজশট; ছবিসূত্রঃ মোবাইল Xiaomi A1

মুচমুচে দুই পাড়ের মাঝখানে স্প্রিং রোলের মত এই ওন্থন খুব কম জায়গায় পাওয়া যায় আমাদের দেশে। ঐতিহ্যগতভাবে এই ওন্থনের আদিনিবাস হলো চীনে। চীনের প্রতিটি প্রদেশেই এর ভিন্নতা পাওয়া যায়। বেইজিং, সিচুয়ান, হুবেই, জিয়াংনান, জিয়াংজি, গুয়াংডং, ফুজিয়ান প্রভৃতি অঞ্চলে এর রান্নার পদ্ধতি ও এর মধ্যকার উপকরণ অনেকটাই ভিন্ন। সর্বপ্রথম সেটি সপ্তম অথবা অষ্টক শতকের দিকেই চীনের তুরফান অঞ্চলে পাওয়া যায়। এখনো চীনের অনেক এলাকায় এটি সিদ্ধ ডামপ্লিং টাইপের একটি কুইজিন হিসেবে রান্না করে। যা স্যুপ দিয়ে খায়।

আমরা সাধারণত যে স্টাইলের ওন্থন খাই সেটির প্রচলন হয় সর্বপ্রথম আমেরিকায়। এপেটাইজার হিসেবে এই ফ্রায়েড ওন্থনের ভেতরে সাধারণত পেঁয়াজের পাতা, সয়া সস, আদা, মুরগীর মাংসের পুর দিয়ে মাঝের অংশটি ভরাট থাকে। আমরা যে ওন্থন খেয়েছি সেটা আসলে স্প্রিং রোল ও আমেরিকান স্টাইল ওন্থনের একটি মিশ্রিত রূপ। বাংলাদেশে অধিকাংশ জায়গায় ট্র্যাডিশনাল আমেরিকান স্টাইল ডিপ ফ্রায়েড ওন্থনটিই পাওয়া যায়।

স্পেশাল ওন্থন; ছবিসূত্রঃ মোবাইল Xiaomi A1

এটি অনেকেই শুধু সস দিয়ে কিংবা কিছু ছাড়াই খেয়ে নেয়। কিন্তু আমরা খাচ্ছিলাম আমাদের সিচুয়ান স্যুপ দিয়ে। মোট ৬টি ওন্থন ছিলো আমাদের। ৩টি করে দু’জন খেয়ে ফেলেছি নিমেষের মধ্যেই। এরপর শুধু স্যুপই টেস্ট করেছি সারাক্ষণ।

এবার আসি আমাদের আসল খাওয়া-দাওয়া পর্ব। এ পর্বে শুধু খেয়েছি আর একটি একটি করে উপাদান আবিষ্কার করেছি। স্যুপ থেকে যে স্মেলটা আসছিলো সেটা সত্যি অসাধারণ। প্রচুর ধনে পাতা দেওয়ার জন্য ভাপে ধনে পাতা সিদ্ধ হলে যে ঘ্রাণটা পাওয়া যায় স্যুপ মুখে দিয়ে সেই অনুভূতি হচ্ছিলো আমাদের। দাতের নিচে কিড়মিড় করে মচমচে ভাজা চালগুলো যখন ভেঙে যাচ্ছিলো তখন আঠালো সসি স্যুপের সাথে সে মিশ্রণ মোটেই মন্দ লাগেনি। সসটায় সবধরণের মশলার ও লবণের পরিমাণ পরিমিত ছিলো। কথা-আড্ডা-গল্পের ভাজে ভাজে এর স্বাদ অপূর্ব লাগছে।

স্যুপ; ছবিসূত্রঃ নিজস্ব মোবাইল Xiaomi Y1 Lite

কিছুক্ষণ পর আবিষ্কার করলাম এর মধ্যে মিহি করে কাটা মাশরুম রয়েছে। আবার একটু পর সাদা একধরণের রাবারি পদার্থ চিবোতে চিবোতে টের পেলাম এটা চিংড়ি খাচ্ছি। আবার আমার বন্ধুটি একটু পর বললো এতে মুরগীর মাংসও একদম ব্লেন্ড আকারে আছে।

সিচুয়ান স্যুপের ক্লোজশট; ছবিসূত্রঃ মোবাইল Xiaomi A1

শেষ দিকে এসে আমরা খেতে খেতে চালের সাথে চালের লেগে যাওয়া গুঁড়া পেয়েছিলাম সেগুলো খেতে মোটেই ভালো লাগেনি। কিন্তু এই একটি ব্যাপার বাদ দিলে পুরো স্যুপটি এক কথায় ‘জাস্ট পার্ফেক্ট’।

খাবার

খাবারের মান নিয়ে সন্দেহ রাখার কোনো অবকাশই তারা দেয়নি। উপরের বর্ণনায় তারই কিছুটা প্রতিফলন হয়েছে আশা করি। খাবারের পরিমাণ দু’জনের জন্য যথেষ্ট। আমার টেস্টবাড অনুযায়ী যদি বলি তাহলে স্যুপ পাবে ৮.৫/১০ এবং ওন্থন পাবে ৯/১০। মানুষভেদে রুচির ভিন্নতা হতেই পারে। নিজের টাকায় খেয়ে নিজের শান্তি অনুযায়ী লিখেছি। তবে এতটুকু আশ্বস্ত করতে পারি খাবারটা একবার হলে চেখে দেখে আসুন। অন্তত ঠকবেন না।

দাম

স্পেশাল ওন্থন ৬ পিসের দাম ছিলো ২৩০ টাকা ও সিচুয়ান স্যুপ ১ঃ২ এর দাম ছিলো ২২০ টাকা। একটি ছোট পানি মিলিয়ে মোট বিল এসেছিলো ৪৬৫ টাকা। কোনো ভ্যাট নেই খাদ্যের মূল্যের সাথে। দাম অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ও খাবার মান দুটোই ভালো।

মূল্যমানের সনদ; ছবিসূত্রঃ নিজস্ব মোবাইল Xiaomi Y1 Lite

পরিবেশ

ভেতরের ইন্টেরিয়র খুবই সুন্দর। আধুনিকতার ছাপ লক্ষ করা যায় তাদের অভ্যন্তর বিন্যাসে। খুব পরিষ্কার ও পরিবপাটি সবকিছু। একজন ক্লিনারকেও দেখতে পেয়েছি সেখানে সবস্ময় ঝাড়ামোছা করতে। ভেতরে বাচ্চাদের জন্য খেলার একটি কর্ণার করা হয়েছে। সবমিলিয়ে একে রেটিং করতে দিলে অনায়াসে ৯/১০  পাবে।

ইন্টেরিয়রের একাংশ; ছবিসূত্রঃ PlacesMap.net

সার্ভিস

ড্রিংক্স অর্ডার নিতে যখন এসেছিলো তখন পানি চাইতে তারা দিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু বোতলের মুখটি খোলে দেয়নি। আমি একজন ওয়েটারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম (যিনি আমাদের অর্ডার নিতে এসেছিলো) সিচুয়ান স্যুপ সম্পর্কে। তিনি সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে চলে যান। একটু পর আরেকজন এসে আমাদের সে সম্পর্কে বলেন। কথা হলো ওয়েটারদের উচিত ছিলো তাদের মেন্যু সম্বন্ধে ভালোভাবে জানা। সব মিলিয়ে তাদের সার্ভিসকে আমি ৫/১০ দিবো।

স্থান

২/১২, পল্লবী(পল্লবী বাস স্ট্যান্ড), মিরপুর সাড়ে এগারো, ঢাকা-১২১৬।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here