বান্দরবানের বগা লেক অভিযানে যেসব খাবার খেতে পারেন

0
690

বান্দরবান থেকে রুমা যাওয়ার পথেই যাত্রাবিরতিতে পাওয়া যায় ছোট পাহাড়ি বাজার। এখানে পাহাড়ের তাজা, ফরমালিন ও কৃত্রিম রংমুক্ত ফলমূল পাওয়া যায়। আমরা তাই যাত্রাবিরতির নাস্তা হিসেবে এখান থেকে দুই পদের আম কিনে নিলাম। একটি হলো বহুল পরিচিত এবং বিখ্যাত আম্রপালি, অন্যটি পাহাড়ি আম রাংখুয়াই। দুইধরনের আমের কেজির মূল্য ৮০ টাকা।

রাংখুয়াই আম; Image source : মাদিহা মৌ

বান্দরবানের রুটে, অর্থাৎ বগা লেক যাওয়ার রাস্তায় আরো একবার এসেছিলাম। তখনো এখানে বসে ফ্রেশ কলা খেয়েছিলাম। আমার কলাপ্রীতি এসেছিলো এই বান্দরবানে এসেই। এখানকার কলা এত সুস্বাদু! তাছাড়া পাহাড়ের খাড়াই বেয়ে উঠতে প্রচুর এনার্জির দরকার হয়। কলাতে এনার্জি প্রচুর পরিমাণে থাকে। তাই লোকসংখ্যা বেশি হলে কাঁদি বা ছড়া হিসেবে কলাও কিনে নিতে পারেন।

জাম ভর্তা; Image source : মাদিহা মৌ

ফলের গুণকীর্তন এখনোও শেষ হয়নি। রুমা বাজার এসে দেখলাম, কয়েকজন পাহাড়ি মহিলা খুব টসটসে জাম বিক্রি করছে। চট করে জাম কিনে নিলাম ৫০ টাকার। দামাদামি করলে হয়তো আরোও কমে দিতো, কিন্তু ইচ্ছে করলো না। এই কয়টা টাকার জন্য এত মজার জাম নিয়ে ঝগড়া করতে ইচ্ছে হলো না। রুমা বাজার থেকে চাঁদের গাড়ি করে বগা লেক যেতে যেতেও মিষ্টি জাম খেয়েছি। আর পরে সিয়াম দিদির কটেজে গিয়ে জিভে জল আনা জাম ভর্তা বানিয়ে খাইয়েছে ইভানা।

সিয়াম দিদির ঘরের খাবার-দাবার

বগা লেকের পাশে একটি বম পাড়া এবং একটি মুরং পাড়া আছে। স্থানীয় আদিবাসীরা বম , মুরং বা ম্রো , তঞ্চংগ্যা এবং ত্রিপুরাসহ অন্যান্য আদিবাসী। বিশেষ করে বম উপজাতিরাই বগা লেকে ভ্রমণকারীদের থাকার জন্য কটেজ তৈরি করে নিয়েছে।

কুমড়ো ভাজি; Image source : মাদিহা মৌ

বগা লেকের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে সিয়াম দিদির ঘরে উঠতে হবে। কটেজগুলো বাঁশের বেতি দিয়ে বানানো, হ্রদের পানির উপরে মাচার মতো দাঁড়িয়ে আছে। আর সিয়ামদির কটেজ ভাড়া করা মানেই, দিদির ঘরের খাবার। দিদির ঘরেই খেতে হবে, তা নয়। তবে সিয়াম দিদির রান্নাই সবচেয়ে ভালো। জুম চালের ভাত, কাঁচামরিচ ভর্তা, জুমের কুমড়া ভাজি, আলু ভর্তা, ডিম ভাজি, পুঁই শাক, ডাল দিয়ে জম্পেশ রাতের খাবার খাওয়া হলো।

পাহাড়ি পরিবেশে মুক্ত হাওয়ায় দারুণ খিদে পায়। এই অতি সাধারণ খাবারই সবাই পেট ভরার পরেও আরেকটু বেশি খেল। আমি চার বছর আগেও একবার বগা লেকে এসেছিলাম। তখনো সবাই রাক্ষসের মতো খেয়েছিলো। তখন ভেবেছিলাম, পাহাড় বাওয়ার পরিশ্রমের কারণে ওভাবে খেয়েছে সবাই। কিন্তু এবারে যেহেতু পুরো পথ গাড়িতে গিয়েছি, তাই পরিশ্রমের কোনো ব্যাপার নেই। তবুও আমরা রাতের খাবার এরকম হাপুস-হুপুস করেই খেয়েছি। সিয়ামদির রান্নার হাতে কী যেন এক জাদু আছে, নইলে এত সুস্বাদের আর কী অর্থ থাকতে পারে?

পুঁইশাক; Image source : মাদিহা মৌ

রাতেই দিদি জানিয়ে দিলেন, সকালের জন্য আছে খিচুড়ি, ডিম ভাজা, অলু ভর্তা, মরিচ ভর্তা আর ডাল। সকালে খাব কি না তা জানিয়ে দিতে হবে আগে থেকেই। একবাক্যে বলে দিলাম, খাব। সকালে খেতে বসে রাতের কুমড়ো ভাজির জন্য খুব মন কাঁদলো। তবে ডিমভাজা দিয়েও খাবারটা নেহায়েত মন্দ হয়নি।

আমাদের মধ্যে কে যেন খিচুড়ির মধ্যেই একটুখানি ডাল নিয়ে বললো, ডাল দিয়েও খিচুড়ি ভালোই লাগছে। শুধু নাক সিঁটকালাম, খিচুড়ি কি ডাল দিয়ে খায়? খিচুড়িতে তো ডাল এম্নিতেই আছে। পরে কী মনে হতে, এক চামচ তুলে নিলাম পাতে। বেশ লাগলো খেতে।

খিচুড়ি ডিমভাজি; Image source : মাদিহা মৌ

সকালের খাবার খাওয়া শেষ করেই দিদিকে জানালাম, আমরা দুপুরে খেয়েই যাব। দুপুরেও জুম চালের ভাত, মরিচ ভর্তা, জুমের কুমড়া ভাজি, আলু ভর্তা, ডিমের ঝোল, পুঁইশাক, পাহাড়ি কচু, ডালের সাথে সাথে অন্যরকম একটা জিনিস পরিবেশন করলো দিদি। কাঁচা আম, কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে অদ্ভুত ধরনের ভর্তা বানিয়ে নিয়েছে। টক-টক ভর্তাটা খেতে দারুণ লেগেছিল।

আম ভর্তা; Image source : মাদিহা মৌ

সিয়াম দিদির ঘরের খাবার খেতে হলে আগে থেকেই জানিয়ে রাখতে হবে কয়জনে খাবেন। নইলে কিন্তু খাওয়ার সময়ে খাবার পাওয়া যাবে না। আরো একটি ব্যাপার, এসব খাবারে প্রচুর ঝাল থাকে। যারা ঝাল খেতে পারেন না, তাদেরকে আগে থেকেই সাবধান করে দিচ্ছি।

কীভাবে যাবেন বগা লেক

প্রথমে আপনাকে বান্দরবান শহরে যেতে হবে। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন বান্দরবানের উদ্দেশ্যে কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির গাড়ি ছেড়ে যায়। যেমন : শ্যামলি, হানিফ, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন- এর যেকোনো একটি বাসে চড়ে আপনি বান্দরবানের যেতে পারেন। রাত ১০ টায় অথবা সাড়ে ১১ টার দিকে কলাবাগান, সায়েদাবাদ বা ফকিরাপুল থেকে এসব বাস বান্দরবানের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। নন এসি বাসে জন প্রতি ভাড়া ৫৫০ টাকা। এসি ৯৫০ টাকা।

ডিমের ঝোল; Image source : মাদিহা মৌ

চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান যেতে পারেন। বদ্দারহাট থেকে বান্দরবানের উদ্দেশে পূবালী ও পূর্বানী পরিবহনের বাস যায়। এসব বাসে জনপ্রতি ১১০ টাকা ভাড়া রাখা হয়।

এবার আপনাকে বান্দরবান হতে বাস কিংবা চান্দেরগাড়িতে করে যেতে হবে রুমা। অবশ্যই বিকাল ৪টার মধ্যে পৌঁছাতে হবে, ৪টার পরে সেনাবাহিনী আর নতুন কোন চান্দের গাড়ি বগা লেক এর উদ্দেশে রওনা দেওয়ার অনুমতি দেয় না। রুমা বাজার থেকে চান্দের গাড়িতে ৪ ঘণ্টা লাগে বগা লেক যেতে।

সিয়াম দিদির ঘরের খাবার; Image source : মাদিহা মৌ

বান্দরবান থেকে রুমা উপজেলা সদরে যেতে খরচ হবে জনপ্রতি ১২০ টাকা। রুমা থেকে বগালেক যেতে জিপ ভাড়া পড়বে ১৮০০-২০০০ টাকা। যাওয়ার আগে সিয়ামদির সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। সিয়াম দিদির ফোন নাম্বার – 01840721590।

feature Image : মাদিহা মৌ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here