বান্দরবানের রোয়াংছড়ির খাবার সমাচার

0
879

পাথুরে দুর্গম খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে কল কল শব্দে বয়ে চলেছে ঝিরির স্ফটিক স্বচ্ছ জলধারা।  তারই পাশে গাঢ় সবুজ ঘাসের বিছানায় যদি আয়োজন করা হয় মধ্যাহ্ন ভোজনের, তাহলে কেমন হবে ব্যাপারটা? কী স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে না? এরকম পরিবেশে খাওয়ার ব্যবস্থা কিন্তু আছে এই বাংলাদেশেই। কিন্তু সেজন্য আপনাকে যেতে হবে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার শীলবাঁধা পাড়ায়।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, বান্দরবান বেড়াতে গেলেই যে খাওয়ার ক্ষেত্রে যে জিনিসটি অবশ্যই মনে রাখবেন তা হলো- বান্দরবানে ফরমালিন ছাড়া তাজা এবং সুস্বাদু ফল পাওয়া যায়। শহরের বাইরের যেকোনো গ্রাম্য বাজারে যেকোনো ফল পেলেই, তা খাওয়ার সুযোগ হারানো উচিত নয়। আপনি যদি ফল খেতে ভালো না বাসেন, বান্দরবানের ফল চেখে দেখতে যেন ভুলবেন না। সবসময় কলা খেতে অপছন্দ করা এই আমি এখন নিয়মিত কলা খাই, বান্দরবানের কলা খাওয়ার পর থেকে।

বান্দরবানের ফল বাজার; Image source : jagonews.com

শীলবাঁধা পাড়ার দুপুরের খাবার

শীলবাঁধা পাড়ায় ভ্রমণকারীরা সাধারণত যায় দেবতাখুম দেখতে যাবার সময়ে। এই পাড়াতে দেবতাখুমের ভ্রমণকারীদের জন্য একটি ক্যান্টিন আছে। খানিক আগে যেমনটি বলছিলাম, পাহাড়ের পাদদেশে ছোট একটা জলপ্রপাতের পাশ ঘেঁষে বাঁশ, ছন, চাটাই দিয়ে বানানো হয়েছে ক্যান্টিনটি।

ক্যান্টিনের বাইরে বাঁশ কেটে চমৎকার টেবিল আর বেঞ্চি বানানো হয়েছে। আমরা দেড়ঘণ্টার ট্রেকিং শেষে এখানে বসে বিশ্রাম নিলাম। দলের দুয়েকজন বেঁকে না বসলে এই সময়টাতেই খাবার খেয়ে নিতাম। যেহেতু দুপুরের খাবারে দেরি হবে, তাই ক্যান্টিনের দোকান থেকে ড্রাই কেক আর কফি খেয়ে নিয়ে রওনা হলাম দেবতাখুমের দিকে৷ যদিও জায়গাটি এতোই স্নিগ্ধ ছিল যে এটা ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছে করছিল না।

শিলবাঁধা ক্যান্টিনে বাঁশ দিয়ে বানানো টেবিল-বেঞ্চি; Image source : মাদিহা মৌ

দেবতাখুমে দাপাদাপি করে ক্যান্টিনে যখন ফিরে এলাম, তখন প্রায় সাড়ে চারটা বাজে। পেটে ছুঁচোর কেত্তন চলছে৷ এসেই খাবার দিয়ে দিতে বললাম। সে সময়ে আরো একটা দল দুপুরের খাবার খাচ্ছিল। তাই বাঁশ দিয়ে বানানো বেঞ্চি টেবিল ফাঁকা পেলাম না। মন খারাপ হয়ে গেল, গরমের মধ্যে ক্যান্টিনের ভিতরে বসে খেতে হবে ভেবে।

খানিক বাদেই দেখি, ক্যান্টিনের এক লোক আর আমাদের গাইড মিলে ভেতর থেকে টেবিল বের করে ঝিরির ধারে পেতেছে। তারপর ভাত, ডাল, লেবু, কাঁচা মরিচ, আলুভর্তা আর পাকিস্তানি মুরগির ঝোল ঝোল তরকারি পরিবেশন করা হয়েছে।

কলাপাতায় জুম চালের ভাত; Image source : মাদিহা মৌ

খুশি মনে খেতে বসলাম। ভাতের প্লেটের নিচে কলাপাতা বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবেশনের এই দিকটিও ভালো লেগেছে। কিন্তু আমাদের কয়েকজন পাতা তুলে ফেলে দিলো, ডাল দিয়ে ভাত খেতে অসুবিধা হবে বলে। পরিবেশ দারুণ, পরিবেশনা দারুণ, পেটে দারুণ খিদে- তাহলে আর দেরি কেন? খেতে শুরু করলাম আমরা।

কিন্তু ভাত মাখিয়ে খাবার মুখে দিতেই বুঝলাম, পরিবেশ আর পরিবেশনায় মুগ্ধ হয়েই খাবার গিলতে হবে। আলু ভর্তার আলু সেদ্ধ হয়নি। কোনো রকমে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ দিয়ে চটকে দেওয়া হয়েছে। একই রকম হাল মুরগির তরকারীরও। মাংস ভালোভাবে সেদ্ধ হয়নি, পাতলা ঝোলে প্রচুর ঝাল৷ পাহাড়িরা সম্ভবত প্রচুর ঝাল খেতে ভালোবাসে।

যা হোক, রান্না সুস্বাদু হলে ঝালটা তেমন কোনো ব্যাপার নয়। পাহাড়ে এসে পাহাড়িদের রান্না আরো খেয়েছি। সব জায়গাতেই খাবার খেয়ে খুব তৃপ্তি পেয়েছি৷ কেবল এই শিলবাঁধা পাড়াতেই খিদে থাকায় লেবু চিপে কোনোরকমে খাবার খেয়ে শেষ করেছি।

মুরগির ঝোল; Image source : মাদিহা মৌ

খরচ

শিলবাঁধা ক্যান্টিনে খাবারের দামও ছিল তুলনামূলক বেশি বান্দরবানের অন্যান্য পাহাড়ি জায়গার তুলনায়। মুরগি সেট মেন্যুর দাম পড়ে প্রতি জনে ১৮০ টাকা। আর ডিম সেট মেন্যুর দাম পড়ে প্রতি জনে ১২০ টাকা।

কচ্ছপতলী পাড়ার রাতের খাবার

দেবতাখুম যেতে হলে কচ্ছপতলী গিয়ে গাইডসহ আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হয়। আমাদের ইচ্ছে ছিল রাতে শিলবাঁধা পাড়াতে থাকব। কিন্তু কচ্ছপতলীর আর্মি ক্যাম্প থেকে ওখানে থাকার অনুমতি পাইনি। তাই আমাদের রাতে থাকার ব্যবস্থা হলো গাইড অংখিঙের মামার বাসায়। একই সাথে তিনি আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থাও করলেন।

ডাল; Image source : মাদিহা মৌ

সারাদিনের ট্রেকিং শেষে তখন প্রচণ্ড ক্লান্ত। সেই সাথে ক্ষুধার্তও। গাইড অংখিং আমাদের খাবার নিয়ে এলেন। জুম চালের ভাত, আলুভর্তা, বেশি করে পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে ডিম ভাজি আর ডাল। খাওয়ার আগে একবার মনে হলো, শিলবাঁধা পাড়ার মতো রান্না হলে তো এক লোকমাও খাওয়া যাবে না। অভুক্তই না থাকতে হয়!

অল্প করে ভাত বেড়ে নিয়ে আলুভর্তা মেখে খেতে শুরু করলাম। একি! এটা তো অমৃত! এই আলুভর্তা তো বগা লেকের সিয়াম দিদির বানানো আলুভর্তাকেও অতিক্রম করে গেছে! ভরসা পাওয়ায় সাথে ডিমও নিয়ে ফেললাম। এটাও চমৎকার করে ভেজেছে। ডাল রান্নাটাও ভালো হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আমাদের এই খাবার আমরা প্রায় কাড়াকাড়ি করে খেয়েছি। পরে কথা বলে জানতে পেরেছি, অংখিঙের মামা সাবেক আর্মি। লম্বা সময় ধরে বাঙালিদের মাঝে থেকেছেন। তাই বাঙালিদের রুচি বোঝেন। খাবার পর একপানা পাহাড়ি কলাও দিয়ে গেলেন।

নৈসর্গিক পরিবেশে খাওয়ার আমেজই আলাদা; Image source : মাদিহা মৌ

এখানে থাকতে হলে, কিংবা এখানকার খাবার খেতে চাইলে আপনার গাইড হিসেবে অংখিংকেই নিতে হবে। আমাদের বাজেট কম ছিল বলে আমরা ডাল আলুভর্তা আর ডিমভাজি নিয়েছিলাম। আপনারা অন্য কিছু খেতে চাইলে জানাতে হবে। তারা সেসবের ব্যবস্থা করবে। গাইড অংখিঙের ফোন নাম্বার 01870059250.

খরচ

রাতে আমাদের সাতজনের থাকা খাওয়ায় খরচ হয়েছিল ১৬০০ টাকা। তার মধ্যে ১১০০ ছিল থাকার খরচ, বাকি ৫০০ খাওয়ার। খাওয়ার জন্য জনপ্রতি খরচ পড়ে ৭২ টাকা করে।

কীভাবে যাবেন

দেবতাখুম বা তিনাপ অভিযানে গেলে প্রথমেই আপনাকে বাংলাদেশের যে কোন জায়গা থেকে চলে যেতে হবে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায়। সেখানকারই দুটো জায়গা শিলবাঁধা এবং কচ্ছপতলী। বান্দরবান সদর থেকে বাস/চাঁদের গাড়ি/সি এন জি/ মটর সাইকেলে করে রোয়াংছড়ি যেতে একঘণ্টা লাগে। সেখান থেকে সিএনজি বা মটর সাইকেলে কচ্ছপতলী বাজার। বাজারের কাছেই অংখিং এর মামার বাসা। কচ্ছপতলী বাজার থেকে পায়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটলেই শিলবাঁধা পাড়া এবং ক্যান্টিনের দেখা মিলবে।

সেখান থেকে সিএনজি বা মটর সাইকেলে কচ্ছপতলী বাজার। বাজারের কাছেই অংখিং এর মামার বাসা। কচ্ছপতলী বাজার থেকে পায়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটলেই শিলবাঁধা পাড়া এবং ক্যান্টিনের দেখা মিলবে।

Feature Image : মাদিহা মৌ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here