বিভিন্ন ধরনের কাঁচা পাকা আমের আচার সমাহার (পর্ব ১)

0
1366

বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ দুই মাস মধুমাস। বছরের এই সময়টায় আমাদের দেশের সর্বত্র থাকে আমের ছড়াছড়ি। কতো প্রজাতির আম হয় এখানে! আমে বিদ্যমান বিটা-ক্যারোটিন এবং ক্যারোটেনয়েড শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলে। এতে বিদ্যমান বিশেষ ধরনের এনজাইম খাবার হজমে সহায়তা করে। তাই খাবারের পর আম খাওয়ার রেওয়াজ আছে আমাদের সংস্কৃতিতে। আমের মধ্যে থাকা ফাইবার বিপাক ক্রিয়ায় সাহায্য করে।

কাঁচা আমে প্রচুর ভিটামিন সি রয়েছে। শরীরে ভিটামিন সি এর মাত্রা বৃদ্ধি অ্যাজমা প্রতিরোধে দারুণ সহায়ক। আমের মধ্যে থাকা আয়রন, ভিটামিন এ, সি এবং বি৬ গর্ভবতী নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এর ফলে, গর্ভাবস্থায় শারীরিক সমস্যার আশঙ্কা কমে যায় অনেকটা। এজন্য গর্ভবতীদেরকে কাঁচা আমের ভর্তা খেতে দেখা যায়। এছাড়া এতে থাকা ভিটামিন-এ দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটিয়ে থাকে।

কাঁচা আম; Image source: হাবিবা

আমের এই মৌসুমে নিয়মিত তাজা আম খাওয়া শরীরের পক্ষে খুব উপকারী। কিন্তু নিজের গাছের অতিরিক্ত কাঁচা এবং পাঁকা আম সংরক্ষণ করে রাখতে হবে না? আমাদের দেশে তাই আম সংরক্ষণ করার সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় হলো আমের আচার তৈরি করে রাখা। আবহমান সময় থেকে আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের নারীরা বিভিন্ন পদ্ধতিতে আচার বানিয়ে সংরক্ষণ করে আসছেন। মেয়েদের পাশাপাশি অনেক ছেলেও আচার খেতে পছন্দ করে। তাই আজ কাঁচা এবং পাঁকা আমের বিভিন্ন ধরনের আচার বানানোর উপায় নিয়ে লিখব।

আমসত্ত্ব বা আমসি

ছোটো বড় সবাই পাঁকা আমের মিষ্টি আমসি বা আমসত্ত্ব পছন্দ করে। কাঁচা আম দিয়েও আমসি বানানো যায়, তবে তা একটু টক টক হয়। আমাদের দেশে মিষ্টি আমসত্ত্ব বা আমসি খালি তো খাওয়া হয়ই, আর টক আমসি খাওয়া হয় দুধ ভাতের সাথে। সেক্ষেত্রে আমসিটুকু সারারাত একটু পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হয়, যেন তা নরম হতে পারে। তাহলে চলুন দেখে আসি কীভাবে আমসত্ত্ব বা আমসি বানাতে হয়।

আমসত্ত্ব বা আমসি; Image source : মাদিহা মৌ

প্রয়োজনীয় উপকরণ

৫ কেজি আম
১ কেজি চিনি

প্রস্তুত প্রণালি

আম কুচি করে কেটে নিন। বিচি ফেলে দিতে হবে। চুলায় কড়াই বসিয়ে, তাতে সবটুকু আম পরিমাণ মতো পানি দিয়ে সেদ্ধ করুন। সেদ্ধ করা নরম আম চালুনি দিয়ে চেলে নিন। সবটুকু আঁশ ছাড়ানো মিহি আমের মণ্ডে চিনি দিয়ে ডালা বা চালুনিতে টাটকা রোদে শুকিয়ে নিন।

অনেকে কয়েক স্তরে আমসত্ত্ব খেতে পছন্দ করে। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন একই ডালায় একটু একটু করে আমের মণ্ড ঢেলে দিয়ে শুকাতে হবে। যখন আমসত্ত্বটি একদম শুকিয়ে আসবে, তখন তা সংরক্ষণের উপযোগী।

আমের কলিজা

বাজারের ম্যাংগো বার খেতে পছন্দ করেন অনেকেই। তারচেয়ে নিজেই বাসায় বানিয়ে নিন জিনিসটি। আপনার বানানো ম্যাঙ্গো বার বাজারের প্যাকেটজাত ম্যাঙ্গো বারের চেয়ে কোনো অংশে কম সুস্বাদু হবে না, বরং বেশিই হবে। গ্রামের নানী দাদীরা একে ডাকে আমের কলিজা।

আমের কলিজা বা ম্যাঙ্গো বার; Image source : মাদিহা মৌ

প্রয়োজনীয় উপকরণ

৫ কেজি আম
২.৫ কেজি চিনি
২৫০ মিলি লিটার সরিষার তেল
৪ টেবিল চামচ লবণ
মরিচ বাঁটা (স্বাদমতো। বাধ্যতামূলক নয়)
সরিষা বাঁটা (স্বাদমতো। বাধ্যতামূলক নয়)
পাঁচফোড়ন বাঁটা (স্বাদমতো। বাধ্যতামূলক নয়)

প্রস্তুত প্রণালি

আম কুচি করে কেটে নিন। বিচি ফেলে দিতে হবে। চুলায় কড়াই বসিয়ে, তাতে সবটুকু আম পরিমাণ মতো পানি দিয়ে সেদ্ধ করুন। সেদ্ধ করা নরম আম চালুনি দিয়ে চেলে নিন। এবারে কড়াইয়ে সরিষার তেল দিয়ে মসলা কষিয়ে আঁশ ছাড়ানো মিহি আমটুকু চিনিসহ দিয়ে দিন। ঝাল টক স্বাদ পছন্দ করলে পরিমাণমতো মরিচ বাঁটা, সরিষা বাঁটা, পাঁচফোড়ন বাঁটা দেওয়া যায়।

কিছুক্ষণ রান্না করে চুলা থেকে কড়াই নামিয়ে নিন। ডালা বা চালুনিতে রোদে শুকাতে নিন। রোদে দেওয়া ঝামে হলে ডালায় করে চুলার নিচে কয়েকদিন রেখে দিলেও চলবে। একটু শুকিয়ে এলে ছুরি দিয়ে মনমতো আকৃতিতে কেটে নিন। তৈরি হয়ে গেল আমের কলিজা বা ম্যাঙ্গো বার।

আমের কলিজা; Image source : মাদিহা মৌ

কাঁচা আমের আচার

চুলোয় না রান্না করেও যে আচার বানানো যায়, এটা হয়তো অনেকেই জানে না। আমিও জানতাম না, এবার মামীর সাথে আচার বানাতে গিয়ে দেখলাম। এতো মজা এই আচারটা! আচারের চেয়েও আচারের ঝোলটা বেশি মজা। একদম জিভে জল এনে দেয়। চলুন দেখে নিই, কীভাবে কাঁচা আমের আচার বানাতে হয়।

কাঁচা আমের আচার; Image source : মাদিহা মৌ

প্রয়োজনীয় উপকরণ

৫ কেজি আম
২ কেজি চিনি
৫০০ মিলি লিটার সরিষার তেল
২০০ গ্রাম পাঁচফোড়ন
১০০ গ্রাম সরিষা
১০ গ্রাম শুকনো মরিচ
১ কাপ সিরকা
১ কাপ লবণ

রোদে প্রক্রিয়াজাতকৃত কাঁচা আমের আচার; Image source : মাদিহা মৌ

প্রস্তুত প্রণালি

সব মশলা মিহি করে বেটে নিতে হবে। বাটা ঝামেলা মনে হলে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিলেও চলবে। মাঝারি আকারের কাঁচা আম আট টুকরো করে কেটে নিন। একটি বড় বোলে নিয়ে আট পদের বাটা মসলা ও চিনি দিয়ে মাখিয়ে নিন আমগুলো।

এরপর একটা বড় বয়ামে সিরকা, সরিষার তেল নিয়ে মসলা ও চিনি মাখানো আমগুলো ঢেলে দিন। টাটকা রোদে টানা রাখতে হবে ১৫-২০ দিন। রোদেই কাঁচা আমগুলো প্রক্রিয়াজাত হবে। আমের মধ্যে মসলা ঢুকবে ধীরে ধীরে। কড়া রোদ না পড়লে দিনের সংখ্যা বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে আম নরম হওয়ার আগপর্যন্ত বয়াম ভর্তি আম রোদে দিতে হবে।

feature Image : মাদিহা মৌ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here