বড় কাটারার গলির জুস, পুরি ও লুচি-মাংস

0
1194

পুরান ঢাকার বড় কাটারা সম্পর্কে জানি অনেকেই। এই জায়গাটিও পুরান ঢাকার একটি দর্শনীয় স্থান। যদিও পূর্বের ন্যায় দেখার কিছুই নেই আর। তবে রয়ে গেছে বড় কাটারার বেশ কিছু অংশ। যে কারণে মূলত বড় কাটারার দিকে পা ফেলা হয় ভ্রমণপ্রিয়, পুরানো ঐতিহ্যবাহী জায়গাগুলো নিয়ে আগ্রহ থাকা মানুষদের।

ঘোরাঘুরি এবং খাওয়াদাওয়া, এই দুটোই মূলত আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ। কোথায় ঘোরার মত জায়গা রয়েছে, কোথায় বিশেষ লোভনীয় খাবার রয়েছে এসব নিয়েই ছোটাছুটি চলে। বড় কাটারা ভ্রমণকালে বাবার কাছে জেনেছিলাম এখানে বিশেষ এক ভর্তা-ভাত পাওয়া যায়। তবে সময় ও সুযোগের অভাবে সেদিন আর যাওয়া হয়নি।

বড় কাটারা; source: লেখিকা

সেদিন যাওয়া না হলেও পরে সুযোগ করে ঠিকই চলে গেলাম। উদ্দেশ্য বড় কাটারার গলির ভর্তা-ভাত সম্পর্কে জানা। এই ভর্তা ভাত বড় কিংবা ছোট কোনো হোটেলে পাওয়া যায় না। গলির মুখে হাড়িতে নিয়ে বসেন এক বিক্রেতা। সেখান থেকেই কিনে খান লোকজন।

এটিকে মূলত ‘ভাকা-ভাত’ বলা হয়। এই ভাতটি সাধারণ চাল দিয়ে না, চালে থাকা কথিত ‘খুঁদ চাল’ থেকে তৈরি হয়। সাথে হরেক রকম ভর্তা। অনেকে এখান থেকে ‘ভাকা-ভাত’ কিনে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে খান। আমার এই খাবারটি খাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও আগ্রহ ছিল কাছ থেকে দেখা ও খাবারটি সম্পর্কে জানা।

কনিকা জুস কর্নার; source: লেখিকা

শুক্রবার হওয়ায় পাওয়া গেলো না সেই ভর্তা-ভাত। কিছুটা হতাশ হলাম। তবে পেলাম ‘কনিকা জুস কর্ণার’-এর দেখা। সেদিন সকালের দিকে আসায় এই জুস কর্ণারের দেখা পাইনি। জুস কর্ণারটি নিয়ে কৌতুহলের কারণ হলো জুস কর্ণারটি ঘিরে থাকা মানুষের বিশাল ভিড়।

অনেকটা আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। ছোট্ট ভ্যান, চারিদিকে কাচ ঘিরে জুস কর্ণারটি তৈরি করা হয়েছে ভ্যানের ভেতর। “পাকা আমের জুস ১৫ টাকা” লেখা কাগজটিই মূলত এই জুস কর্ণারের প্রতি মানুষদের আকৃষ্ট করে থাকে।

স্ট্রিট জুস কর্ণার; source: লেখিকা

ভ্যানের ভেতর ভর্তি পাকা আম। সাথে আরো কিছু উপকরণ ও ব্লেন্ডার মেশিন। ভিড় জমিয়ে থাকে লোকজন। হাতে গ্লাভস পরে পাকা আম কেটে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে তৈরি করা হয় পাকা আমের জুস। সাথে দেয়া হয় চিনি, লবণ, বিট লবণ, পানি ও হালকা কাচা মরিচ।

কিছুটা ভিড় কমতে কথা হয় এই জুস কর্ণারের মালিকের সঙ্গে। রোজ বিকেলেই এখানে আসেন তিনি। এই জুস বিক্রিই তার মূল কাজ। বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ফলের জুস বিক্রি করে থাকেন তিনি। এই জুস বিক্রির টাকাতেই চলে তার পুরো সংসার।

পাকা আমের জুস; source: লেখিকা

মূলত বড় কাটারার গলিতেই প্রতিদিন দাঁড়ান তিনি। এখানেই বেচা-বিক্রি করেন। তার এই জুস পছন্দ করেন আশেপাশের অনেকেই। রোজ বিকেলে কেউ কেউ আড্ডা দেন, তাদের আড্ডার সঙ্গী হয় কণিকা জুস কর্ণারের জুস।

চেখে দেখতে অর্ডার করি এক গ্লাস জুস। ঝটপট বানিয়ে ফেলেন তিনি। তবে হাতে পেয়ে খাবো কিনা ভাবতে থাকি। আশেপাশের পরিবেশ কিছুটা অস্বস্তি দিচ্ছিল। তবে তবুও এক চুমুক দিলাম।

কড়া মিষ্টি স্বাদ, পাকা আমের ঘন এক জুস। পুরোটা শেষ করার সাধ্য হলো না। গ্লাস ফিরিয়ে, টাকা মিটিয়ে অন্য দিকে পথ ধরলাম। আরো অনেককে সুযোগ করে দিলাম দাঁড়াতে। আমার খুব একটা ভালো না থাকলেও অনেকে এই জুস বেশ আয়েশ করে খান।

জুসের স্বাদ

আমের জুস; source: লেখিকা

জুসটা তৈরির মূল উপাদান পাকা আম। সাথে দেয়া হয় চিনি, বিট লবণ আর কাচা মরিচ আর সামান্য পরিমাণ পানি। কাচা মরিচের স্বাদ যদিও খুব একটা পাইনি। কড়া মিষ্টি ছিল। যে কারণে জুসটি শেষ করার ইচ্ছে হয়নি।

রেটিং- ৪/১০

মূল্য

মূল্য চার্ট; source: লেখিকা

এক গ্লাস পাকা আমের শরবতের মূল্য ১৫ টাকা। স্থানীয় ও  আশেপাশে কর্মরত অনেকেই বেশ কম মূল্যে পাওয়ায় জুসটির জন্য ভিড় জমায়।

পরিবেশ

বড় কাটারার গলিটি খুব বেশি বড় নয়। বড় কাটারার কিছুটা আগেই এই জুস কর্ণারটি। পেছনে রাস্তার অংশ কাটা। বেশ ময়লা আবর্জনা পড়ে আছে। অনেকেরই এই পরিবেশ ভালোলাগবে না।

বড় কাটারার গলির পুরি ও লুচি-মাংস

লুচি-মাংস ও চা; source: লেখিকা

বড় কাটারার গলির রাস্তার ডান, বাম উভয় পাশেই রয়েছে দুটি হোটেল। এই হোটেল দুটিতে তৈরি হয় বেশ মজাদার পুরি। ডাল পুরি, আলু পুরি, মাংস পুরি, মাছের পুরি, সবজি পুরিসহ বেশ কয়েক রকম পুরি পাওয়া যায় এখানে। পাবেন লুচি আর মাংসও। পুরিগুলো খেতে বেশ মজার। এখানকার পরিবেশও তুলনামূলক ভালো। হোটেলের ভেতর বসে খেয়ে নিতে পারবেন স্বাচ্ছন্দ্যে।

আমের জুস না খেতে পেরে ভাবলাম অন্য কিছু খাওয়া যাক। গিয়ে বসলাম একটি হোটেলে। হোটেলটির সামনে কোনো নাম নেই। বড় কাটারার গলির পাশেই এই হোটেলটি। এখানে এমন আরো অসংখ্য হোটেল রয়েছে। তার যেকোনোটিতেই আপনি বেশ আয়েশ করে খেতে পারবেন।

তখনই ভাজা হচ্ছিল, অর্ডার করতেই গরম গরম ডাল পুরি, লুচি আর গরুর মাংস। কিছু সময় পর বেশ স্বস্তি নিয়ে খেলাম।

স্বাদ

এই পুরিগুলো খেতে বেশ মজা। গরম গরম পুরির সঙ্গে তারা বিশেষ এক ধরনের ঝোল দেয় খেতে। সেই ঝোলে ডুবিয়ে পুরি খেতে বেশ মজাদার। আমার খুব ভালো লেগেছে। আর লুচি ও গরুর মাংস বেশ সুস্বাদু ছিল।

রেটিং

ডাল পুরি- ৭/১০

লুচি- ৭/১০

গরুর মাংস- ৮/১০

মূল্য

এখানকার ডাল পুরি, আলু পুরি, সবজি পুরি ৫ টাকা করে প্রতি পিস। লুচি ৩ টাকা। মাংস (গরু) ৮০ টাকা। কিমা পুরি, মাংস পুরির দাম কিছুটা বেশি।

সার্ভিস

সার্ভিস বেশ ভালো। ছোট হোটেল হলেও ওয়েটারদের আচরণ বেশ ভালো ছিল। কথায়, কাজে দক্ষ ও বিনয়ী মনে হয়েছে।

লোকেশন

বড় কাটারা সোয়ারীঘাটের দিকে। সোয়ারীঘাট কিংবা চকবাজারে পৌঁছে কাউকে বললেই দেখিয়ে দিবে বড় কাটারার গলি। বড় কাটারার গলিতে ঢুকলেই পাবেন কণিকা জুস কর্ণার ও বেশ কিছু খাবার হোটেল।

ফিচার ইমেজ- লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here