ভাত ভর্তা আর প্রকৃতির টানে মিরপুর বেড়িবাঁধে একদিন

0
1013

ঢাকার অলিতে-গলিতে ফ্রায়েড রাইস, চাইনিজ আর বাহারি খাবারের অসংখ্য রেস্টুরেন্ট থাকলেও, আয়েশ করে ভাত খাওয়ার মতো জায়গার অভাব আছে বলা যায়। যদিও রেস্টুরেন্টের কৃত্রিম পরিবেশে ভাত খাওয়ার জায়গার অভাব নেই। কিন্তু প্রকৃতি দেখতে দেখতে ভাত খাওয়ার স্বাদ নিতে চাইলে হাতেগোনা কয়েকটা জায়গা আছে। তেমনই একটি জায়গা হলো মিরপুর বেড়িবাঁধ।

অনেকদিনের ইচ্ছে ছিলো মিরপুর বেড়িবাঁধে ঘুরতে যাবো আর সাথে ভাত-ভর্তা খেয়ে আসবো। ওদিকের ভাত-ভর্তার অনেক প্রশংসা শুনেছি। মিরপুরের জ্যামের কথা ভাবতে ভাবতে আর যাওয়াই হচ্ছিলো না। এরপর ইদ চলে এলো। ঢাকায় ইদ করার বড় সুবিধা হলো, জ্যাম ছাড়া রাস্তাঘাট। যেহেতু জ্যাম থাকবে না, তাই সুযোগ পেয়েই ইদের পরদিন মিরপুর রওনা দিয়ে দিলাম। ফাঁকা রাস্তায় বাস ছুটে গেলো মিরপুর বেড়িবাঁধের দিকে।

সুস্বাদু ভর্তার প্লেট; Source: লেখিকা

বেড়িবাঁধে গিয়ে কোথায় স্বল্পমূল্যে ভালো খাবার খেতে পারবো আগেই খোঁজ নিয়ে গিয়েছিলাম। কিছু রেস্টুরেন্ট আছে যেগুলোতে খাবারের মান তেমন উন্নত না হলেও, মূল্য অত্যাধিক। সেজন্যই খোঁজখবর করে যাওয়াই ভালো। আগে থেকেই জেনে গিয়েছিলাম তামান্না পার্কের সামনের প্রায় সবকয়টি দোকানের ভাত, ভর্তা এবং মাছ ভাজা বেশ সুস্বাদু। বেড়িবাঁধ পৌঁছুতে দুপুর হয়ে যাওয়ায় প্রথমেই খাবারের খোঁজ করি।

মিরপুর এক থেকে রিকশায় চড়ে রিকশাওয়ালাকে বলে দিই সরাসরি তামান্না পার্কের সামনে চলে যেতে। যেহেতু এবারই প্রথম গিয়েছিলাম, জায়গাটা ছিলো একবারে অচেনা। রিকশা থেকে তামান্না পার্কের গেইটের সামনে নেমেই দেখি রাস্তার পাশে অনেকগুলো ভাতের হোটেল বা ছোটখাটো রেস্টুরেন্ট। প্রথমে দুম করে কোনোটাতে বসে না গিয়ে পুরো এরিয়াটা ঘুরে দুই-তিনটা হোটেল ঘুরে পছন্দসই একটিতে বসে যাই।

প্রকৃতি আর ভর্তা; Source: লেখিকা

শুধু ঘুরে পছন্দ করে দেখলেই হবে না, খাবারের দাম শুরুতেই জিজ্ঞেস করে নেবেন। ওদিকের মূল সমস্যাই হয় খাবারের দাম নিয়ে। কোনোরকম মেন্যুকার্ড পাবেন না। তাই দাম জিজ্ঞেস করে খেতে বসাই ভালো। আমরা যেখানে বসেছিলাম সেই হোটেলটির নাম ছিলো নিরিবিলি। পাশেই চাচার হোটেলসহ আরো অনেকগুলো হোটেল আছে। সবগুলোতেই দাম এবং স্বাদ প্রায় একই। আমরা বসেছিলাম ঠিক নদীর পাড়েই ছাতার নিচে রাখা একটি টেবিলে।

সেদিন প্রচণ্ড গরম থাকলেও ওখানে বসে খেতেই ভালো লাগছিলো। এছাড়া চাটাই এবং টিনের তৈরি ধাবার মতো জায়গায় বসে খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। ওখানে ফ্যানও আছে। বসার জন্য সাধারণ কাঠের চেয়ার-টেবিল থাকবে। আর নদীর পাড় ঘেষে বসার জায়গাগুলোতে প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল থাকবে। ভেতরে বসার চেয়ে বাইরে বসাই ভালো। প্রাকৃতিক পরিবেশও থাকলো, খেতে বসে বেশ প্রশান্তিও অনুভব করা যায়।

তেলাপিয়া মাছ ভাজা; Source: লেখিকা

আমরা যখন পৌঁছুলাম পেটে তখন প্রচণ্ড ক্ষুধা। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়, হোটেলটির ম্যানেজার জানালেন সিলিণ্ডার গ্যাস শেষ হয়ে গিয়েছে। গ্যাস আনতে গেছে একজন। আর গ্যাস না থাকলে তো মাছ ভাজা সম্ভব নয়। অগত্যা অপেক্ষা করতে হলো প্রায় চল্লিশ মিনিট। গ্যাস আসার পরেই আমরা ভাত আর ভর্তা পরিবেশন করতে বললাম। ওদিকে মাছও দেখিয়ে দিলাম ভাজার জন্য।

মিরপুর বেড়িবাঁধে ভর্তা বেশ সস্তা। একেকটি ভর্তা মাত্র পাঁচ টাকা করে। আমরা পুরো এক প্লেট ভর্তাই নিয়েছিলাম। পুরো প্লেটটির মূল্য ছিলো মাত্র একশত টাকা। প্লেটটির মধ্যে মোট দশধরনের ভর্তা ছিলো। শুরু করেছিলাম আলু ভর্তা দিয়ে। আর ভর্তা খাওয়া শেষ করেছিলাম মরিচ ভর্তা দিয়ে। মাঝখানে কালিজিরা ভর্তা, শুটকি ভর্তা, মাছ ভর্তা, মাংস ভর্তাসহ আরো কয়েক ধরনের ভর্তা ছিলো। সব কয়টি ভর্তার স্বাদই ছিলো মনে রাখার মতো।

ভাত ভর্তা; Source: লেখিকা

বাইরের অনেক হোটেলে ভর্তা খেয়েছি। ভর্তাগুলো খেতে গিয়ে প্রায় অনেক জায়গাতেই দেখেছি স্বাদ প্রায় একই। একটি ভর্তা থেকে অন্যটির স্বাদ আলাদা করা যাচ্ছে না। মিরপুর বেড়িবাঁধে ছিলো একদম ব্যতিক্রম। প্রায় সবকটি ভর্তারই নিজস্ব স্বাদ ছিলো। ভর্তাগুলোর এই ব্যাপারটিই বেশি ভালো লেগেছিলো। আমি প্রায় দুই প্লেট ভর্তা দিয়ে খেয়ে ফেলেছিলাম। পেট পুরোপুরি ভরে গেলেও তখনও মাছ খাওয়া বাকি। তাই মাছের দিকে হাত বাড়ালাম।

বেরিবাঁধের প্রায় সবকটি হোটেলেই তাজা তেলাপিয়া মাছ চোখের সামনে ভেজে দেয়। মাছগুলো দেখলেই বোঝা যায় একবারেই তাজা মাছ। তাই ভাজার পরেও খেতে খুবই সুস্বাদু লাগে। মাছের আকার অনু্যায়ী দাম রাখে প্রায় সবকটি হোটেলেই। তবু অর্ডার দেয়ার আগে দাম জিজ্ঞেস করে নিতে ভুলবেন না। ভর্তা আর মাছ ভাজা শেষ করে ডাল নিয়েছিলাম। ডাল মানে ও স্বাদে একবারেই সাধারণ।

উপভোগ করার মতো মাছ ভাজার দৃশ্য; Source: লেখিকা

তামান্না পার্কের সামনে ভাত খাওয়া শেষ করে আমরা চলে গিয়েছিলাম পাশের পার্ক এবং রেস্টুরেন্ট নেভারল্যাণ্ড দি আরবান এস্কেপে। সেখানের রেস্টুরেন্টিতে চাইনিজ আর থাই খাবার পাওয়া যায়। আর বাইরে একটি জুসবার আছে। নদীর পাড়ে বসে থাকতে থাকতে আমরা কোল্ডকফি আর লাচ্ছি নিয়েছিলাম। দুটোর একটির স্বাদও ভালো লাগেনি। এছাড়াও ওখানে আইসক্রিম, জুস ইত্যাদি পাওয়া যায়। নদীর পাড়ে বসে সময় কাটানো ছাড়াও ঘণ্টা হিসেবে নৌকা নিয়েও ঘোরা যায় নেভারল্যাণ্ড দি আরবান এস্কেপে।

রেটিং

ভর্তা এবং মাছ মাছার জন্য আমি মিরপুর বেড়িবাঁধের ভাতভর্তাগুলোকে ৮/১০ দেবো।

মূল্য

ভর্তা: ৫-১০ টাকা
মাছ: ১০০-২৫০ টাকা (আকার অনুযায়ী)
কোল্ডকফি: ১০০ টাকা
লাচ্ছি: ৮০ টাকা

পরিবেশ

এমন পরিবেশে বসে ভর্তা ভাত খাওয়া যে-কারো জন্যই খুবই লোভনীয়; Source: লেখিকা

খাবার তো আছেই কিন্তু মিরপুর বেড়িবাঁধ যাওয়া শুধু খাবারের জন্যই নয়। ঢাকার যান্ত্রিক পরিবেশ থেকে একটুখানি মুক্তির জন্য মিরপুর বেড়িবাঁধ যথাযথ একটি জায়গা। চারদিকে নদী, সবুজ সবকিছু মিলিয়ে চোখের শান্তি দেয়। আমার বেশি ভালো লেগেছিলো মিরপুর এক থেকে বেড়িবাঁধ পর্যন্ত রিকশা দিয়ে যেতে।

নদীরপাড়ের রাস্তাটি কিছুক্ষণের জন্য ক্লান্তি ভুলিয়ে সতেজ করে দেয়। ওখানে নৌকা দিয়েও ঘোরা যায়। তবে এক্ষেত্রে বেশি মানুষজন নিয়ে যাওয়া ভালো। আর ওদিকে গেলে বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসা উচিত। সন্ধ্যার পর জায়গাটি তেমন নিরাপদ নয়।

Feature Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here