সালাম’স কিচেন এর শাহী মাটন বিরিয়ানী ও জাফরানি পোলাও

0
896

ঢাকা শহরে থাকা হচ্ছে প্রায় ছয় মাস ধরে। এই সময়ের মধ্যে নামিদামি কোনো রেস্টুরেন্টে যে খাওয়া হয়নি; এমন নয়। তবে হুট করেই সালাম’স কিচেন রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া মূলত আমার স্বামীর ভূয়সী প্রশংসার কারণে। বান্ধবীকে নিয়ে আগে কয়েকবার এই রেস্তোরাঁতে যাওয়া হয়েছিল তার। তার শখ ছিল বিয়ের পর বউকে নিয়ে এখানে খাবে। কাজসূত্রে আজ যখন রেস্তোরাঁর পাশেই যেতে হল, সুযোগটা আর মিস করল না। স্বামীর শখ পূরণ করতে চলে তার সাথে আমিও গেলাম সালাম’স কিচেনে।

image source: Monika Shams

আমরা যখন রেস্তোরাঁর কাছাকাছি পৌঁছুলাম তখন ঘড়ির কাটা দুপুর দু’টো ছুঁই ছুঁই করছে। পুরোদমে লাঞ্চ আওয়ার বলা যায়। সিঁড়ি বেয়ে রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করার সাথে সাথে মনটা ভাল হয়ে গেল। কী শান্ত আর ঝকঝকে পরিবেশ! তিন সারিতে ভাগ করে রাখা টেবিলগুলোর মাঝামাঝি দিকের একটা টেবিলে বসে মেন্যু কার্ডে চোখ বুলিয়ে নিলাম। যেহেতু আমি সালাম’স কিচেনে প্রথমবার, তাই খাবার চয়েজের দায়িত্বটা পড়ল আমার ওপরে।

image source: Harriken

বিভিন্ন প্রকার আইটেমে ভরপুর মেন্যু কার্ড। দু’জন পেট ভরে খাওয়ার জন্য সেট মেন্যু থেকে খাবার অর্ডার করে বেসিনে হাত ধুতে চলে গেলাম।

খাবারের খুঁটিনাটি

মেন্যু কার্ডের সেট মেন্যুতে মোটামুটি ছয় রকম সেটের খাবার তালিকা ছিল। আমরা সেট মেন্যুর প্রথম দুটো মেন্যু অর্ডার করেছিলাম। প্রথম সেট মেন্যুতে ছিল- শাহী মাটন কাচ্চি বিরিয়ানী (যেটাতে বাসমতি মেহরানি চাল ব্যবহার করা হয়), একটা আস্ত সেদ্ধ ডিম ফ্রাই, আলু বোখারার চাটনি ও সালাদ এবং ২য় সেট মেন্যুতে ছিল- জাফরানি পোলাও, চিকেন রোস্ট (সালাম’স কিচেন স্পেশাল), একই চাটনি ও সালাদ।

খাবার অর্ডার করার মোটামুটি ১০ মিনিটের মাঝেই টেবিলে পৌঁছে গেছে আমাদের কাঙ্খিত খাবারগুলো। সময় নষ্ট না করে খেতে শুরু করালাম। একবার মুখে দিয়েই বুঝে গেলাম স্বামীর প্রশংসা করার কারণ। নিছক প্রশংসা ছিল না! প্রশংসা করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে।

সেট মেন্যু ১ শাহী মাটন কাচ্চি বিরিয়ানী; image source: Monika Shams

প্রথম সেট মেন্যুর শাহী মাটন কাচ্চি বিরিয়ানীতে মাটন হিসেবে খাসির মাংস ব্যবহার করা হয়েছে। এক লোকমা বিরিয়ানী মুখে নিলাম। আমি সচরাচর খাসির মাংস খাই না। অনেক সময় খাসির মাংসে একটা গন্ধ থাকে, যেটা খাসির মাংসের প্রতি অরুচি নিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু অদ্ভুতভাবে লক্ষ্য করলাম, খাবারে অরুচি আনতে পারে এরকম কোনো গন্ধ এই বিরিয়ানীতে নেই! তার ওপর মাংসের বড় টুকরোটি যথেষ্ট নরম ও সুস্বাদু। হাত দেবার সাথে সাথেই ভেঙ্গে যাচ্ছিল।

আমার যে স্বামী চিকেন ছাড়া আর কোনো মাংসই গলদঃকরণ করতে পারে না ঠিকঠাকভাবে, দেখা গেল সে নিজেই গোগ্রাসে খাসির মাংস গিলছে। তার চোখে-মুখে প্রশান্তি। বিরিয়ানীতে তেল একটুও কমবা বেশি ছিল না। ফলে খাবার শেষ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। একইসাথে বিরিয়ানীর সাথে থাকা ডিমটাও ঠিকঠাক ছিল।

প্রথম মেন্যু শেষ করার পর দ্বিতীয় সেট মেন্যুতে থাকা জাফরানি পোলাওয়ের স্বাদ নিতে শুরু করলাম। আমার স্বামী মহাশয় তো ছন্দ আকারে বলেই ফেলেছিল, “মান ভাঙানোর রানী, জাফরানি বিরিয়ানী”!

সেট মেন্যু ২ জাফরানি পোলাও; image source: Monika Shams

আসলে পোলাও এর স্বাদটা পেট পুরে খাওয়ার ঘরোয়া স্বাদটাই দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, দুপুরে লাঞ্চ করছি ঘরোয়া সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত সুস্বাদু কোনো পোলাওয়ের আইটেম দিয়ে! যা লাগবে পেট ভরাতে ঠিক ততটুকুই যেন প্লেটে নিয়েছি এমন একটা অনুভূতি কাজ করছিল নিজের মধ্যে। ফলে এই প্রথমবার আমি বাইরের কোন রেস্তোরাঁয় প্লেটের সবটুকু খাবার শেষ করতে পেরেছি কোনো কষ্ট ছাড়াই। পাশাপাশি থাকা স্পেশাল চিকেন রোস্টের স্বাদতো আমাকে লাজলজ্জা ভুলে হাড়সহ চিবোতে বাধ্য করেছে!

সালাম’স কিচেনের খাবার মেন্যুর আরেকটা বিশেষত্ব হল- আলু বোখারার চাটনি। যেটার কথা না বললেই নয়। চাটনিটাতে এতটাই টক-ঝাল-মিষ্টির বাহার ছিল যে বাটিতে চাটনি শেষ না হওয়া অব্দি চেটেপুটে খেয়ে এসেছি। সালাদে লেবু, শসা ও কাঁচা মরিচ ছিল। যা খাবার হজমে সহায়তা করেছে। সাথে নিয়েছিলাম এক গ্লাস করে কোল্ড ড্রিঙ্ক ও পানি।

সালাম’স কিচেনের পরিবেশ

সালাম’স কিচেন মূলত বড় রাস্তার পাশেই। সুতরাং গাড়ীর হর্ন ও ধূলায় পরিপূর্ণ থাকার কথা থাকলেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁটি সম্পূর্ণ কোলাহল ও দূষণমুক্ত। তিন তলার সিঁড়ি ভেদ করে রেস্তোরাঁয় পা রাখতেই মাথার ওপরে আলোক ঝলমলে তারার মেলা দেখা যায়। এক মুহূর্তেই মনে হবে, মহাকাশে চলে আসছি। দিনের আলোতেই যার ভেতরটা এত উজ্জ্বল, রাতের অন্ধকারে তার বিশেষত্ব না জানি আরো কত! সেই আফসোসে স্বামীকে বলে দিয়েছি পরবর্তীতে অবশ্যই আমাকে যেন রাতে নিয়ে যায়! সব মিলিয়ে বন্ধু-বান্ধব, কলিগ ও পরিবার নিয়ে যাবার জন্য একটা উপযুক্ত রেস্তোরাঁ বলায় যায় সালাম’স কিচেনকে।

image source: Monika Shams

পরিবেশ ও ওয়েটারদের ভাল ব্যবহারের জন্য খাওয়া শেষ করেও আধা ঘণ্টার মতো বসে ছিলাম আমরা দু’জন। আপনারাও চাইলে আড্ডা ও মিটিঙের জন্য সালাম’স কিচেনকে পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন। এক কথায় উত্তরার কাছাকাছি সাধ্যের মধ্যে এক বেলা পেট পুরে বিরিয়ানী খাওয়ার জন্য সালাম’স কিচেনের মনোরম পরিবেশের জুড়ি মেলা ভার। তাই সুযোগ পেলেই রেস্তোরাঁটিতে ঢু মেরে আসতে পারেন।

image source: Monika Shams

রেটিং

শাহী মাটন কাচ্চি বিরিয়ানী – ৯ /১০

সেদ্ধ আস্ত ডিম ভাজা – ৭/১০

জাফরানি পোলাও – ১০/১০

চিকেন রোস্ট – ১০/১০

আলু বোখারার চাটনি – ১০/ ১০

সালাদ – একদম ঠিকঠাক।

মূল্য

সেট মেন্যু ১

– ১৯০ টাকা (হাফ)

– ৩৬০ টাকা (ফুল)

সেট মেন্যু ২

– ১৮০ টাকা ( হাফ)

– ৩০০ টাকা (ফুল)

কোক – ২৫ টাকা।

পানি – ১৫ টাকা।

১৫% ভ্যাটসহ আমাদের বিল এসেছিল ৪৭০ টাকা।

ঠিকানা

উত্তরার হাউজ বিল্ডিং বাস স্ট্যান্ডে নেমে রিকশা নিয়ে বা পায়ে হেঁটে জমজম টাওয়ারের কাছে এলেই সালাম’স কিচেন চোখে পড়বে। জমজম টাওয়ার থেকে একটু এগিয়ে রাস্তার বিপরীত পাশে ৪০ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলায় সালাম’স কিচেনের অবস্থান। রেস্টুরেন্টটি সপ্তাহের ৭দিনই সকাল ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

Featured Image:Bangladesh Post

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here