হাংরি রেস্টুরেন্টের মজাদার বার্বিকিউ উইংসের সেট মেন্যু!

0
1192

বহু বছর আগে যখন ফ্রায়েড রাইস আবিষ্কার হয়নি, মানুষ কিভাবে বেঁচে থাকতো? কারণ আমার মূল নেশা তো ফ্রায়েড রাইসে। আমি ফ্রায়েড রাইস যে কত খেয়েছি তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তবুও এর প্রতি বিরক্ত হই না। এমনি এক রাতে টিউশনি থেকে ফিরে খুব ফ্রায়েড রাইস খেতে ইচ্ছে হলো। রাতও প্রায় হয়ে গিয়েছে। রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ হবে হবে অবস্থা। এদিকে বাসায় গিয়ে রান্না করে খেতেও ইচ্ছে করছে না। মশলা সব নেই বলে বাসায় ফ্রায়েড রাইস রান্না করতে পারছিনা। তাই বাধ্য হয়ে এত রাতে মনের শান্তি মেটাতে হাতের কাছের রেস্টুরেন্ট গুলোতে খোঁজে বেড়াচ্ছিলাম।

প্রথমেই জেডএফসি তে ঢুকলাম। তাদের মেন্যু আমার মোটামুটি মুখস্তই ছিলো। বললাম ৬ নাম্বার সেট মেন্যুটি দিতে। সেট মেন্যুতে ছিলো দুই পিস ছোট রানের মাংস এবং সেটা ক্রিস্পি করে ভাজা আর সাথে ফ্রায়েড রাইস আর ভেজিটেবলস তো আছেই। জিজ্ঞাসা করতেই বললেন যে, তাদের সেট মেন্যুগুলো আজকের মতো শেষ হয়ে গিয়েছে। ঘড়িতে তখন ১০:০৮ বাজে। তাই ক্ষুধাতুর পেট নিয়েই বেরিয়ে আসলাম সেখান থেকে। এরপর গেলাম পার্পেল রেস্টুরেন্টে। তাদের বাইরে দরজায় ওপেন (OPEN) লিখা থাকায় ঢুকে পড়লাম সেখানে। একই অবস্থা এখানেও। তাদের সেখানে আগামী দিন ফ্রায়েড রাইস বানাবে বলে পোলাওয়ের চাল সিদ্ধ করে ফ্যানের নিচে শুকাতে দিয়েছিলো। গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই বললেন দোকান বন্ধ করে দিয়েছি আজকের মতো। অগত্যা বেরিয়ে এসে শেষ বারের মত খোঁজ করছিলাম আর কোথাও পাবো কিনা।

নতুন এক রেস্টুরেন্ট দেখতে পেলাম। উপরে খরগোশের মাথা সম্বলিত সাইনবোর্ড হাংরি রেস্টুরেন্ট (Hungry Restaurant). এই রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ড দেখে মনে হলো অনেকদিন আগে এদের আরেকটি রেস্টুরেন্ট ছিলো। সেটির নাম ছিলো “হাংরি বানি”। ভাবলাম সেটায় লস হয়েছে বলেই জায়গাটা পরিবর্তন করে নতুনভাবে আরেকটি রেস্টুরেন্ট দিয়েছে। সেই রেস্টুরেন্টের বাইরেও ওপেন লিখা ছিলো। ভাবলাম একবার শেষ চেষ্টা করেই দেখি। ঢুকলাম ভেতরে। গিয়ে দেখি ক্যাশের ওখানে ম্যানেজার বসে আছেন। গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এখনো খোলা আছে কিনা এবং তারা খাবার অর্ডার নিবে কিনা। ভদ্রলোক বললেন এখনো খোলা আছে। আমি বসে পড়লাম তাদের কোণার এক টেবিলে। প্রথমে খুব অবাক হয়েছি যে একটা রেস্টুরেন্ট কিভাবে এত লাল রঙের হয়। প্রথমে কিছুক্ষণ ভালো লাগলেও বিরক্ত লাগছিলো খুব অন্ধকার অন্ধকার লালময় পরিবেশ দেখে।

যাই হোক, অর্ডারের জন্য ম্যানেজার এগিয়ে দিলেন তাদের মেন্যুর কার্ডটি। অনেক ক্ষণ চিন্তা করে নিলাম কি অর্ডার করা যায়। ভাবলাম সবসময় তো ফ্রায়েড চিকেন অর্ডার করি আজ না হয় বার্বিকিউ চিকেনই খাওয়া যাক। খুঁজে পেলাম সেট মেন্যুটি। সেখানে ছিলো মিক্স ফ্রায়েড রাইস, ৩ পিস বার্বিকিউ চিকেন উইংস, মিক্স ভেজিটেবলস, সালাদ ও ড্রিক্স। অর্ডারের সময় একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম চিকেন উইংসে মাংসের পরিমাণ কেমন হবে। তারা বলেছিলো ভালোই হবে। এই সেট মেন্যুটি তাদের সবচেয়ে হিট। আমি ড্রিক্সের পরিবর্তে পানির অর্ডার করেছিলাম। আর কতক্ষণ লাগবে জিজ্ঞাসা করতে তারা বললো ১০ মিনিট লাগবে।

ইটেরিয়রের একাংশ; Source: নিজস্ব মুঠোফোন Xiaomi Y1 Lite

পাঠক, এই ফাঁকে রেস্টুরেন্টটির পুরোটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম। তাদের ইন্টেরিয়রটা খুব সুন্দর ছিলো। আমি ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছিলাম। অনেক অন্ধকার থাকায় ফ্ল্যাশ ব্যবহার করতে হয়েছে। দেয়ালে টাঙানো তাদের সুন্দর কাচের পেইন্টিংগুলো খুব সুন্দর ছিলো। তাদের সেখানে এসির সুব্যবস্থা ছিলো। বসার জন্য ছিলো আরামদায়ক সোফা ও টেবিলটি ছিলো কাচের।

ইটেরিয়রের একাংশ, কাচের আর্টপিস; Source: নিজস্ব মুঠোফোন Xiaomi Y1 Lite

খারাপ লাগলো একটি ব্যাপারে আমি যে টেবিলে বসেছিলাম সেখানে হাত দিতেই খেয়াল করলাম আমার হাতে ঝোল লেগেছিলো। তাদের ব্যাপারটিকে অবহিত করার পর তারা একবার মুছে দিয়ে গেলো। এরপর টেবিলে আবার হাত রাখতেই আবার স্যাঁতস্যাঁতে পানি লাগলো হাতে। রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটি বুঝে আমাকে অন্য একটি পরিষ্কার টেবিল দেখিয়ে বসতে অনুরোধ করলেন। আর বললেন যে, আমি আসার একটু আগেই আমার টেবিলে কাস্টমার এসেছিলো। তাই পরিষ্কার করার সময় পায়নি তারা। আমি কিছু মনে না করে চুপচাপ অপেক্ষা করছিলাম। এর মধ্যে একবার বললাম ড্রিক্সের বদলে যে পানির অর্ডার করেছি সেটা যেনো এখনি দেওয়া হয়।  সত্যিকার অর্থে তেষ্টা পেয়েছিলো ভালোরকমের।

ফেসবুকিং করে সময়ক্ষেপণ করছিলাম তখন। প্রায় ১০ মিনিট পরেই তারা খাবার নিয়ে হাজির। আমাকে তখন আর পায় কে? খাবার দেখতে খুবই ভালো ছিলো। সুন্দর একটা ঘ্রাণ আসছিলো খাবার থেকে। ফটাফট কতগুলো ছবি তুলে ফেললাম।

প্রাপ্ত খাবারের ছবি; Source: নিজস্ব মুঠোফোন Xiaomi Y1 Lite

রাইস আর চামচের কানায় ভেজিটেবলস অল্প করে নিয়ে খাচ্ছি। কাঁটা চামচ দিয়ে চিকেন উইংস খাওয়া কষ্টসাধ্য বলে হাত দিয়েই ভালোমত ধরে মুখে পুরে দিলাম। প্রথমে খেতে ভালো লাগছিলো। কিছুক্ষণ পর একটা টক স্বাদে জিহ্বা পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। বার্বিকিউ এর সস বেশি দিয়ে ফেলেছিলো। এইজন্য ভালো লাগেনি। সবচেয়ে অবাক লেগেছে এটাই যে আমার সেট মেন্যুটি ছিলো ৩ পিস বার্বিকিউ চিকেন উইংস। কিন্তু আমাকে তারা দিয়েছিলো ২টি চিকেন উইংস আর একটি মুরগীর ছোট একটা লেগ পিস।

দুইসাইডে দুটি চিকেন উইংস ও মাঝে ছোট রানের মাংস (যেখানে ৩টিই চিকেন উইংস হবার কথা ছিলো); Source: নিজস্ব মুঠোফোন Xiaomi Y1 Lite

খাবার খাওয়ার এক পর্যায়ে ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনাদের কি পূর্ববর্তী কোনো রেস্টুরেন্ট ছিলো কিনা আর সেটার নাম ‘হাংরি বানি’ ছিলো কিনা। জিজ্ঞাসা করতেই একগাল হেসে তিনি বললেন যে তাদের সেটি বন্ধ করে এই নতুন রেস্টুরেন্টটি দিয়েছেন। ব্লগিং এর জন্য তাকে খাবারের মূল্যমান লিখে রশিদ দেবার কথা বললে তিনি বললেন যে তারা রশিদ বানাতে দিয়েছেন যা এখনো হাতে পাননি। খাবার শেষে যিনি প্লেট নিয়ে যেতে এসেছিলেন জিজ্ঞাসা করলেন যে খাবার কেমন লেগেছে তখন তাদের সত্যটাই বললাম। একটি উইংসের জায়গায় যে মুরগীর ছোট লেগপিস দিয়েছেন সেটির প্রত্যুত্তরে বললেন যে আমি শেষে এসেছি বন্ধ হবার আগে তাই উইংস শেষ হয়ে গিয়েছে। ব্যাপারটি আমার খুব একটা ভালো লাগেনি।

খাবার

চিকেন উইংসের বদৌলতে একটি লেগপিছ দেওয়াটা আমার কাছে প্রফেশনালিজমের অভাব মনে হয়েছে। আমাকে যদি তারা বলতো তাদের এই মেন্যুটি সম্ভবপর হবে না তাহলে অন্য কিছু অর্ডার দিতাম। তারা সেটি না করে খাবারের সময় আমি জানতে পারলাম যে তাদের শর্টেজ আছে। আর টক স্বাদ লেগেছিলো বলে আমার কাছে প্রথম উইংসটি খেতে খারাপ লেগেছিলো। তাই বলবো খাবারের মান এভারেজের কিছুটা নিচে। তাদের এ ব্যাপারটিতে আরো উন্নতির জায়গা আছে।

দাম

তাদের এ সেট মেন্যুটির দাম ছিলো ১৩০ টাকা। দাম অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ভালো ছিলো তবে মান নয়।

মেন্যুসমূহের ছবি; Source: নিজস্ব মুঠোফোন Xiaomi Y1 Lite

পরিবেশ

রেস্টুরেন্টির ভেতরের ইন্টেরিয়র খুবই সুন্দর ছিলো। তবে বেশি লালচে ও অন্ধকার অন্ধকার ভাব হবার জন্য বিরক্তির উদ্রেক হয় কিছুক্ষণ পর।

স্থান

আপনি যদি মিরপুর ১৪ বাসস্ট্যান্ড থেকে কচুক্ষেতের দিকে যান তাহলে কিছুদূর যেতেই হাতের ডান দিকে মমিন স্বরণীর কাছেই  লাগোয়া এই রেস্টুরেন্টটির বাইরের নিরীহ একটি খরগোশের মাথা সম্বলিত আউটলুকটি আপনার চোখে পড়বে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here